বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি থেমে যাবে, শ্রেণিকক্ষ নীরব হবে—কিন্তু স্মৃতির ভেতর থেকে যাবে এক মানুষের নাম, এক শিক্ষকের ছায়া। ঠিক তেমনই এক আবেগঘন বিদায়ে ভালোবাসায় সিক্ত হলেন দেবগ্রাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মো. মাহফুজুর রহমান।
টানা ৩৪ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন শেষে সরকারি বিধি অনুযায়ী অবসরে গেলেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার গণ্যমান্য মানুষদের উপস্থিতিতে আবেগ আর ভালোবাসার এক অনন্য দৃশ্যের জন্ম হয়।
সকালের আলোয় বিদ্যালয় চত্বর যেন অন্যরকম ছিল। পাপড়ি ছিটিয়ে, ফুলের মালায় বরণ করে নেওয়া হয় সেই মানুষটিকে—যিনি বছরের পর বছর ধরে পাঠদান করেছেন শুধু বইয়ের নয়, জীবনেরও। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় মুহূর্তেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ মাহফুজুর রহমান।
সরকারি নিয়মে চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও বিদায়টা ছিল রাজকীয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে সুসজ্জিত গাড়িতে করে প্রিয় শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। গাড়ির পিছু পিছু হাঁটেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা—যেন কেউই তাঁকে বিদায় দিতে চায় না।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, দেবগ্রাম শেখ বাড়ির মরহুম ধন মিয়ার ছেলে শেখ মাহফুজুর রহমান চাকরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বিদ্যালয়ই হয়ে উঠেছিল তাঁর দ্বিতীয় পরিবার।
বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কুমিল্লার উপ-পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী প্রধান শিক্ষক নিজেই। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জুলফিকার হোসেন, বিদ্যালয়ের সাবেক সহ-সভাপতি শেখ মো. আইয়ুবুর রহমান, সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মো. জাবেদ আহমদ খান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী ও মো. শাহাদাত হোসেন। শিক্ষার্থীদের চোখে তিনি শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন একজন অভিভাবক। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “স্যার আমাদের খুব আদর করতেন। পড়াশোনা আর জীবন—দুটোই কীভাবে সুন্দর করা যায়, সব সময় শেখাতেন।”
ইশরাত জাহান বলেন, “তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন আর শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় ভাবতেন।”
বিদায়ী অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শেখ মাহফুজুর রহমান বলেন, “বিদায় যে এত কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি। সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের রেখে চলে যাওয়া সত্যিই বেদনাদায়ক। ৩৪ বছর এক জায়গায় থেকেছি—এটা আমার পরিবার হয়ে গেছে। আমাকে যেভাবে সম্মান জানানো হয়েছে, তা আমৃত্যু মনে থাকবে।”
সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “বিদায়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতেই এমন আয়োজন। তিনি আমাদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন—নিষ্ঠা, সততা আর মানবিকতার এক উজ্জ্বল নাম।”
বিদ্যালয়ের আঙিনায় তখন আর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই—শুধু স্মৃতি, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার দীর্ঘশ্বাস। একজন শিক্ষক বিদায় নিলেন, কিন্তু থেকে গেলেন শত শত হৃদয়ের ভেতরে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

