ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলার। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই ডলারের মাত্রা ১০ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭৩ সালের পর ডলারের মান পতনে এটিই ছিলো সবচেয়ে বড় ধস। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি ও আত্মকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতিকেই এই পতনের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের প্রথম ৬ মাসে ইউরো, পাউন্ডসহ প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন মুদ্রাটির মান ১০ দশমিক ৮ শতাংশ নেমেছে। এর অর্থ দাাঁড়ায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ডলার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এতে ‘নিরাপদ মুদ্রা’ হিসেবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ডলারের মর্যাদা।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতি, স্থিতিশীল আর্থিক বাজার এবং নির্ভরযোগ্য আইনি কাঠামোর কারনেই বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ডলার। কিন্তু ট্রাম্পের নীতির কারণে অনেকেই এখন মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রাম্পের একের পর এক শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণা এবং ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে তার মন্তব্যে বিশ্ববাজারে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এর পাশাপাশি কংগ্রেসে আলোচনারত তাঁর “ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল” নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল পাস হলে আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে জাতীয় ঋণ।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস বলছে, বিলটি ২০৩৪ সালের মধ্যে ফেডারেল ঋণ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেবে। ফলে সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত আরও বেড়ে যাবে, যা বর্তমানে ১২৪ শতাংশে রয়েছে। সেই সঙ্গে বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও বাড়তে পারে। ২০২৪ সালে যা ছিল ৬.৪ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে ৬.৯ শতাংশে পৌঁছাবে।
এছাড়াও, ২ এপ্রিল প্রশাসন বিশ্বের প্রায় সব দেশের আমদানিতে শুল্ক আরোপ করে। এই শুল্ক ঘোষণার দিনকে ট্রাম্প “লিবারেশন ডে” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু এর মাত্র তিন দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার সূচক S&P 500 থেকে হারিয়ে যায় প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য। মার্কিন সরকারি বন্ড থেকেও বিনিয়োগ প্রত্যাহার শুরু হয় ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর।
চাপের মুখে ট্রাম্প ৯ এপ্রিল চীনের পণ্য ছাড়া সব পণ্যে আরোপিত পূর্ব শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তবুও ডলারের ওপর বিনিয়োগকারীদের পূর্ব আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়নি।
এরপর Organisation for Economic Co-operation and Development যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ২.২ শতাংশ থেকে ১.৬ শতাংশে নামিয়ে আনে। যদিও মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশ থেকে কমে মে মাসে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে নেমে এসেছে ধীরগতি।
আবার মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেয় মুডিজ রেটিং এজেন্সি। ট্রাম্পের নীতির অনিশ্চয়তা, অপ্রত্যাশিত খরচ এবং অতিরিক্ত ঋণের পরিকল্পনাই ছিলো এই সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণ।
ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমার আগাম প্রত্যাশা ডলারের পতন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দুই থেকে তিনবার কমতে পারে এই সুদহার।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে মার্কিন শেয়ারবাজারে ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার, ট্রেজারিতে ৭ ট্রিলিয়ন এবং কর্পোরেট বন্ডে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছেন। এই বিনিয়োগ যদি আরও হ্রাস পায়, তাহলে ডলারের মান আরও পতনের মুখে পড়বে।
ডলারের মান এভাবে নামতে থাকলে একদিকে যেমন মার্কিন পণ্য বিদেশে সস্তা হয়ে পড়বে, অন্যদিকে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমলেও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।
তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পতন কিছুটা স্বস্তির। ডলারে ঋণগ্রস্ত দেশগুলো যেমন পাকিস্তান, ঘানা বা জাম্বিয়ার জন্য ঋণ পরিশোধ তুলনামুলক সহজ হবে। পণ্যদ্রব্য রপ্তানিকারক দেশ যেমন চিলি, নাইজেরিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার জন্যও এটি ইতিবাচক। কারণ এতে তাদের রপ্তানি আয়ে সম্ভাব্য বৃদ্ধি আসবে।
তবে বিশ্বজুড়ে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, যদিও সামনে ডলারের মান আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও এটি এখনই রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা হারাবে না। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পতনের গতি কি ট্রাম্প প্রশাসনকে থামাতে পারবে, নাকি বৈশ্বিক বাজারে এর অভিঘাত আরও বাড়বে?
পড়ুন: পাবনায় বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩
দেখুন: বুসানের অবকাঠামো এবং পরিবহন ব্যাবস্থা অনুকরণীয়
ইম/


