কুমিল্লা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, গত দেড় দশকে কুমিল্লা মহানগরীর রাজনীতি, ঠিকাদারি ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর টানা চার মেয়াদে তিনি কুমিল্লা-৬ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ সময় দলীয় কাঠামোয় নিজ অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশ কাটিয়ে তাঁর মেয়ে তাহসীন বাহারকে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা এবং পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনায় দলীয় অন্দরে আলোচনা তৈরি হয়। নির্বাচিত হলেও নানা বিতর্ক ও প্রশাসনিক জটিলতায় তাহসীনের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্যমতে, বাহারের রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, খুনের মামলার আসামি ও তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে বহুদিন ধরেই অভিযোগ ছিল। বিরোধিতাকারীদের ওপর হামলা, দখল-বাণিজ্য, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠদের নাম একাধিকবার আলোচনায় আসে। গত ১৫ বছরে দলীয় কোন্দলে কয়েকজন নেতা-কর্মী হত্যার ঘটনায়ও তাঁর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কুমিল্লা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন মুন্সেফবাড়ি এলাকায় বাহারের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং গ্যারেজে থাকা একাধিক গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রামঘাট এলাকায় নির্মিত দলীয় কার্যালয়সহ কয়েকটি স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটে। ঐতিহ্যবাহী টাউন হল ভেঙে বহুতল বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ এবং বিরোধপূর্ণ জমিতে দলীয় কার্যালয় নির্মাণ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলে জানা যায়।
এরপর বাহার ও তাহসীন আত্মগোপনে যান। একাধিক সূত্রের দাবি, তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমে ভারতে অবস্থান করেন এবং পরে মালয়েশিয়ায় চলে যান। বর্তমানে তারা মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন—এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশের বাইরে অবস্থান করেও কুমিল্লার অপরাধ জগত ও অর্থনৈতিক প্রভাববলয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ক্যাডার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভিন্ন দলের ছত্রছায়ায় সক্রিয় হয়ে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাঠানো হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন সামনে আসেনি।
জেলার একাধিক রাজনৈতিক নেতা মনে করেন, অভিযোগগুলো গুরুতর। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা প্রয়োজন। দেশের বাইরে অবস্থান করে যদি কোনো প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তবে তা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

