আমার ২৫ বছরের শিক্ষক জীবনে আমি অনেক শিক্ষার্থীকে মেডিটেশন চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছি। তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী অসাধারণ সাফল্যও অর্জন করেছে। অসৎ সঙ্গের প্রভাবে নেশায় আসক্ত এক শিক্ষার্থীর জীবন পাল্টে গিয়েছিল নিয়মিত মেডিটেশন চর্চার মাধ্যমে। অনেক বছর পর আমার সাথে দেখা। পড়াশোনায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন শেষে তখন সে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা। মনটা ভরে গিয়েছিল।
আরেকজন শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চ শিক্ষার্থে যাওয়ার আগে আমার সাথে ফোনে কথা বলেছে এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। বলেছে যে, নিয়মিত মেডিটেশন চর্চার ফলে সে তার লক্ষ্য স্থির করতে পেরেছে। এটাই তার সাফল্যের মূল রহস্য। এ ধরনের সাফল্যের ঘটনা আমাকে বিশেষভাবে আনন্দিত করে, আবেগাপ্লুত করে। তখন মনে হয় আমার শিক্ষার্থী জীবনে যদি মেডিটেশনের খোঁজ পেতাম, তাহলে হয়তো জীবনটাকে আরো সুন্দরভাবে গোছাতে পারতাম। নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে ওদের জীবনকে সফল করার চেষ্টার মধ্যেই আমি আমার জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি ।
নিজ জীবনের দিকে ফিরে তাকাই। ৯০ এর দশকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। শিক্ষার্থী হিসেবে ভালো ফলাফল করেই এগোচ্ছিলাম। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা ও বাম ধরার রাজনৈতিক ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ৯০ এর গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। দেশ নিয়ে ভাবনা বরাবরই আমার ছিল। একটা পর্যায়ে পড়াশোনা আর রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে ভারসাম্য না রাখতে পেরে পড়াশোনা থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ি আর দেশ নিয়েও হতাশা বাড়তে থাকে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়নি।
হতাশা ও অতৃপ্তি সাথে নিয়েই কর্মজীবনে প্রবেশ করি ১৯৯৯ সালে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সেখানকার নানা অসঙ্গতিও আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। ক্রমশ দুঃসহ হয়ে উঠেছিল জীবন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আমি মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অবলম্বন খুঁজছিলাম। হঠাৎ ঝলকের মতো মনের গহীন কোণ থেকে উঁকি দিল একটি শব্দ ‘কোয়ান্টাম মেথড’। এই শব্দটা যে কোথায় শুনেছিলাম তা আজও মনে করতে পারি না। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সহপাঠীদের সাথে আড্ডার কোনো এক কথোপকথন থেকে। কিন্তু অন্তরের গভীর থেকে আমি কৃতজ্ঞ সে মানুষটির প্রতি, যার কণ্ঠ থেকে শুনেছিলাম শব্দটি। কোয়ান্টাম মেথড আমার জীবন বদলের চাবিকাঠি। নিউ মার্কেট থেকে বই কিনে প্রথম দিন থেকেই ডুবে গিয়েছিলাম। মেডিটেশন চর্চাও শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই। মাসখানেক পর আমার এক পরিচিতের সাথে দেখা। চিনতেই পারছেন না। সুস্বাস্থ্যে উজ্জ্বল এক প্রাণবন্ত মানুষ আমি তখন। দুবেলা মেডিটেশন চর্চা ছিল আমার দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ। তখনো মেডিটেশনের কোনো কোর্স করিনি, কোর্সের কথা জানতামও না তখন।
২০০৪ সালে মিরপুর কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। পাশেই কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বেশ কজন কর্মীর সাথে পরিচয়। কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের কথা শুনলাম। বুঝতে বুঝতে আরো ছয় বছর লেগে গেল। একটা পর্যায়ে উপলব্ধি করলাম সংঘ ছাড়া নিজেকে আত্মিক পরিশুদ্ধতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য। কোর্স করেছি ২০১০ সালে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাইনি। সংঘের সাথে একাত্ম হয়ে নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যদিয়ে এবং সংঘের উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। শিক্ষকতা পেশার জীবনটাকেও সেবার সুযোগ হিসেবে নিয়েছি। মেডিটেশন চর্চা আমাকে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশকে প্রশান্ত রাখতে সাহায্য করে। নিজে মেডিটেটিভ থাকলে প্রশান্ত থাকা যায়, তখন পড়ানোটাও ভালো হয় এবং শিক্ষার্থীরাও তখন প্রশান্ত থাকে, মনোযোগী থাকে। দেশ নিয়ে ইতিবাচক ভাবনার যে সুতো আমার ছিঁড়ে গিয়েছিল, তাকে আবার সুন্দরভাবে জোড়া লাগাতে পেরেছি কোয়ান্টাম নামের স্বেচ্ছাসেবী সংঘে এসে।
দেশ গড়ার মন্ত্র জেনেছি- ‘ভালো মানুষ ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ’। দেশ নিয়ে ভালো ভাবনা এবং প্রতিটি কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করার মধ্যদিয়েই আমরা এগিয়ে যাব মানবিক মহাসমাজ বিনির্মাণের মনছবি পূরণের পথে। এই অন্তর্প্রেরণা এখন আমার চলার পথের পাথেয়। উপলব্ধি করেছি, জীবিকাই জীবন নয়। জীবন হলো স্রষ্টার দেয়া অমূল্য উপহার। এ জীবনকে রাঙিয়ে তুলতে হয় মানুষের কল্যাণে, সৃষ্টির সেবায় কাজ করার মধ্যদিয়ে। সৎসঙ্গে একাত্মতা সে কাজকে আরো সহজ করে দেয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সবাইকে বিশ্ব মেডিটেশন দিবসের শুভেচ্ছা।
লেখক: সেলিম সাজ্জাদ
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মিরপুর কলেজ।
পড়ুন: শহীদ ওসমান হাদি: এক বিপ্লবীর অসমাপ্ত গল্প
আর/


