১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতিতে গিয়েছে ইরান ও ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তি হিসেবে দেখছে না তেহরান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবলমাত্র একটি ‘কৌশলগত বিরতি’। যুদ্ধের ক্ষত মুছে ফের সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির উপযুক্ত সময় এই যুদ্ধবিরতি। সংবাদ মাধ্যম মিডল ইস্ট আই এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
তেহরানের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতির অংশ হিসেবেই এখন তারা এগোচ্ছে আরেকটি সম্ভাব্য বড় যুদ্ধের দিকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়টিকে কাজে লাগিয়ে সামরিক, কূটনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক তিন ফ্রন্ট পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করছে ইরান।
ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয় ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র সাইট ও পারমাণবিক গবেষণাগার। নিহত হন আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার, মহাকাশ বিভাগের প্রধান এবং একাধিক পারমাণু বিজ্ঞানী। তবুও ইরান নিজেদের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও অচল করে দেয়, যা ইঙ্গিত দেয়, ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই যুদ্ধবিরতির সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, হাইপারসনিক প্রযুক্তি যেমন ‘ফাতাহ’ ও ‘খাইবার শেকান’ উন্নয়নে মনযোগ দিচ্ছে ইরান। পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে চাইছে তারা, যেন ভবিষ্যতে আকাশপথে হামলা আরও কার্যকরভাবে প্রতিহত করা যায়।
এরইমধ্যে তেহরান রাশিয়ার এস-৪০০, সু-৩৫ এবং চীনের জে-১০ ও পঞ্চম প্রজন্মের জে-২০ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। কারণ কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নির্ভরতাই যুদ্ধের সময় যথেষ্ট নয়। আধিপত্যের জন্য চাই পূর্ণাঙ্গ বিমান শক্তি।
ইরানের AWACS বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার অভাব সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর সেই ঘাটতি পূরণ করতেই নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহের জন্য চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করছে তারা।
শুধু সামরিক প্রস্তুতিই নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনেও সরব ইরান। তারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে। ইরানের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে কোনো ঘোষণা ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
তেহরান বলছে, যতক্ষণ না এই বিচারিক প্রক্রিয়া এগোয়, ততক্ষণ তারা কোনো পরমাণু আলোচনায় ফিরবে না। ইতোমধ্যে তারা আইএইএ-এর সঙ্গে সহযোগিতাও স্থগিত করেছে এবং সংস্থাটিকে পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যা দিয়েছে।
এমনকি যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ গোপনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রেখেছে বলেও জানিয়েছে গোপন সূত্র। যেহেতু হামলার পর সেসব জায়গায় তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন পাওয়া যায়নি, ধারণা করা হচ্ছে, ইউরেনিয়ামের মজুদ অক্ষত রয়েছে। এটি ভবিষ্যতে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখন কেবল যুদ্ধের ক্ষতিই কাটিয়ে উঠছে না, বরং সময়কে অস্ত্রে পরিণত করে ধাপে ধাপে ভবিষ্যতের বৃহৎ সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।
তেহরান মনে করে, সময়ই তাদের সবচেয়ে বড় সমর্থক। কারণ সময়ের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে আরও চাপে পড়বে ইসরায়েল।
তাই বলা হচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতি তেহরানের জন্য বিরতি নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য গেমপ্ল্যান সাজানোর সুযোগ। সময়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধ এখন চলছে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে।
শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘ লড়াইয়ে জয়ী কে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দিনলিপিতে।
পড়ুন: ইসরায়েলকে ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি!
দেখুন: সংস্কার ছাড়া জনগণ নির্বাচন মেনে নেবে না’ |
ইম/


