রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলে সোমবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ (বিজিআই) যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩২ জন নিরীহ মানুষ, যাদের অধিকাংশই ছিলেন কোমলমতি শিক্ষার্থী। আহতের সংখ্যা অনেক। এখনো অনেকে নিখোঁজ। এই অচিন্তনীয় ঘটনায় পুরো জাতি আজ স্তব্ধ, শোকাহত এবং স্বভাবতই প্রশ্নমুখর।
এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, একটি বৃহৎ কাঠামোগত বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে। যেখানে পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্ঘটনার পরপরই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন নাগরিক মহলে যে প্রশ্ন ও মতামত উত্থাপিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই যৌক্তিক; কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব প্রশ্নের পেছনে থাকা সত্যটুকু জানা এবং প্রতিকারের পথে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
প্রথমেই উল্লেখযোগ্য, দুর্ঘটনায় পতিত এফ-৭ বিমানটি ‘পুরাতন’ কিংবা ‘উড়ন্ত কফিন’ ছিল। এই ধারণাটি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। উক্ত বিমানটি ২০১৩ সালে চীন থেকে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থায় সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নীতিমালায় পূর্বে ব্যবহৃত বা পুরাতন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের অনুমতি নেই। তদুপরি, ১২ বছর বয়স কোনো সামরিক যুদ্ধবিমানের জন্যই অতিরিক্ত নয় বরং নির্মাণ শৈলী এবং প্রযুক্তিগতভাবে এটি এখনো অন্তত আরোও ১২-১৫ বছর কার্যকর থাকার কথা। যেটাকে টেকনিক্যাল ভাষায় ‘সার্ভিস লাইফ‘ বলা হয়ে থাকে। রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলে সোমবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ (বিজিআই) যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩২ জন নিরীহ মানুষ, যাদের অধিকাংশই ছিলেন কোমলমতি শিক্ষার্থী। আহতের সংখ্যা অনেক। এখনো অনেকে নিখোঁজ। এই অচিন্তনীয় ঘটনায় পুরো জাতি আজ স্তব্ধ, শোকাহত এবং স্বভাবতই প্রশ্নমুখর।
এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, একটি বৃহৎ কাঠামোগত বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে। যেখানে পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্ঘটনার পরপরই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন নাগরিক মহলে যে প্রশ্ন ও মতামত উত্থাপিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই যৌক্তিক; কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব প্রশ্নের পেছনে থাকা সত্যটুকু জানা এবং প্রতিকারের পথে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
প্রথমেই উল্লেখযোগ্য, দুর্ঘটনায় পতিত এফ-৭ বিমানটি ‘পুরাতন’ কিংবা ‘উড়ন্ত কফিন’ ছিল। এই ধারণাটি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। উক্ত বিমানটি ২০১৩ সালে চীন থেকে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থায় সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নীতিমালায় পূর্বে ব্যবহৃত বা পুরাতন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের অনুমতি নেই। তদুপরি, ১২ বছর বয়স কোনো সামরিক যুদ্ধবিমানের জন্যই অতিরিক্ত নয় বরং নির্মাণ শৈলী এবং প্রযুক্তিগতভাবে এটি এখনো অন্তত আরোও ১২-১৫ বছর কার্যকর থাকার কথা। যেটাকে টেকনিক্যাল ভাষায় ‘সার্ভিস লাইফ‘ বলা হয়ে থাকে।

চীনের পক্ষ থেকে এই F-7 সিরিজের যুদ্ধবিমান উৎপাদন বন্ধ করার প্রসঙ্গও বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সামরিক বিমান প্রযুক্তির জগতে ‘উৎপাদন বন্ধ’ মানেই অকার্যকর হয়ে যাওয়া নয়। বরং, বিভিন্ন দেশ পুরাতন ডিজাইনের ভিত্তিতে উন্নত সংস্করণ চালু রাখে। F-7-এরই আধুনিকায়িত বর্তমান সংস্করণ JF-17 যেটা চীন ও পাকিস্তানের সম্মিলিত প্রজেক্ট এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান বাহিনীতে আকাশ যুদ্ধের কাজে ফ্রন্ট লাইন প্লাটফর্ম হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে JF-17 যুদ্ধবিমানের উল্লেখযোগ্য অবদান পরিলক্ষিত হয়েছে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বৈমানিকের বিষয়ে একটি ভুল ব্যাখ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে তিনি নাকি প্রশিক্ষণের শেষ দিনে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, সামরিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ বহু স্তর বিশিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি। উক্ত বৈমানিক প্রশিক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলেন, যেখানে এককভাবে উড্ডয়নের যোগ্যতা যাচাই করা হয়। সুতরাং, এটি প্রশিক্ষণের প্রারম্ভিক পর্যায়ে ছিল, যা ট্রেনিং সিলেবাসের সেই পর্যায় যখন একজন প্রশিক্ষক কোন শিক্ষানবিশ পাইলটকে একা বিমান পরিচালনার যোগ্য মনে করেন এবং সম্পূর্ণ একা সেই বিমানটি উড্ডয়নের অনুমতি দেন। মনে রাখতে হবে, দূর্ঘটনায় নিহত পাইলট F-7 যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণ শুরুর পূর্বে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে অন্যান্য প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানে পূর্ণ সিলেবাস সাফল্যের সাথে উত্তরন করেছেন।

আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে—শহরের ভেতরে কেন প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালিত হয়?
ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টি স্থাপিত হয় এমন সময়ে, যখন তার আশপাশে নগরায়নের ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের ফলে আজ এটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটি একটি নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতার চিত্র, যা শুধু বিমানঘাঁটি কিংবা বিমানবন্দর নয় বরং ঢাকার সামগ্রিক নাগরিক নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাইলস্টোন স্কুলের কম্পাউন্ড-এর অবস্থান রানওয়ের সম্প্রসারিত সীমানার মধ্যে, যা বেসামরিক বিমান পরিবহন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আইনের ব্যত্যয় এবং একটি অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক নগর বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করে।
ইজেক্ট না করে পাইলট দেরি করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও তদন্তাধীন। একটি দ্রুতগামী যুদ্ধবিমান যখন কোন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন পাইলটকে স্প্লিট সেকেন্ডের ভেতর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেখানে অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি ও প্রযুক্তিগত জটিলতার ধরন ইত্যাদি সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই সেইফ জোন কিংবা সঠিক সময়ে ইজেক্ট করা কিংবা না করা সংক্রান্ত এই প্রশ্নের নির্ভূল উত্তর পরিপূর্ণ তদন্ত ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়েও নানা বিতর্ক উঠেছে। একদিকে জনসচেতনতা ও মানবিকতা, অন্যদিকে বিপর্যয়কালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা রক্ষা, এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা সবসময় সহজ নয়। উৎসুক জনতার ভিড় মাঝে মাঝে উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাই সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতির জটিলতাও অনুধাবন জরুরি।

বস্তুতঃ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, স্ট্রাটেজিক সামরিক কাঠামো, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেসব প্রশ্ন ও উদ্বেগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। কারও দোষ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা সে যেই হোক না কেন।
তবে তারও আগে প্রয়োজন, দায়িত্বশীলতা ও সংযম। অনুমানভিত্তিক আলোচনা, সামাজিক মাধ্যমে অগ্রহণযোগ্য ভাষা বা স্বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন এখন নির্ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয়ভাবে আত্মসমালোচনা ও উত্তর খোঁজার প্রয়াস।এই দুর্ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল যে উড়োজাহাজ কেবল আকাশে ওড়ে না, সে ভেঙে পড়লে মাটির মানুষও চূর্ণ হয়। আগামী দিনের পথচলায় যেন একই ট্রাজেডির পূনরাবৃত্তি না ঘটে, এজন্য আজই সাহসী, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
লেখক : রাশেদ আমীন, স্কোয়াড্রন লীডার (অবঃ), বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।
পড়ুন: মাইলস্টোন ট্রাজেডি : আহত-নিহতদের তালিকা তৈরিতে কমিটি গঠন


