ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ লেবাননের বিনত জবেইল, শেবা ও চাকরার মতো সীমান্তবর্তী জনপদ। গত শনিবার লেবাননে চালানো ইসরায়েলের চারটি পৃথক ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত একজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ। তথ্য আলজাজিরার।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, বিনত জবেইল শহরের সাফ আল-হাওয়া এলাকায় একটি গাড়িতে চালানো ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই একজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হামলার কিছুক্ষণের মধ্যেই একই এলাকায় আরেকটি ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল।
এর আগে, শেবা শহরের একটি বসতবাড়িতে চালানো হামলায় আহত হন আরও একজন। শহরটি লেবানন, সিরিয়া ও ইসরায়েল অধিকৃত গোলান হাইটস সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত।
একই দিনে ইসরায়েলি ড্রোনের তৃতীয় হামলাটি হয় বিনত জবেইল জেলারই চাকরা শহরে। সেখানে দুইজন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, সেটি কার্যত প্রতিদিনই লঙ্ঘন করছে তেলআবিব। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে চলছে ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান ও ড্রোন হামলা। এসব হামলায় একাধিক আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রাণ গেছে বহু মানুষের।
ইসরায়েল দাবি করছে, তাদের হামলা মূলত হিজবুল্লাহ এবং ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর গোপন স্থাপনা ও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে করা। তবে যুদ্ধবিরতির পর থেকে হিজবুল্লাহ মাত্র একটি পাল্টা হামলা করেছে।
বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরও বাদ যায়নি এই দফায়। আবাসিক ভবন ধ্বংস করে আতঙ্ক তৈরি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলায় আরও একজন নিহত হন এবং তিনজন আহত হন। এলাকাটি লেবাননের একমাত্র বাণিজ্যিক বিমানবন্দরের একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত।
এই হামলার দায় স্বীকার করে ইসরায়েল জানায়, তারা একজন ইরানি-ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসীকে টার্গেট করেছে।
নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তানুযায়ী, হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর উত্তরে তাদের যোদ্ধাদের সরিয়ে নিতে হয়েছিল। সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে লিতানি নদীর দক্ষিণে কেবল লেবাননের সেনাবাহিনী এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা অবস্থান করতে পারবে এমনই ছিল চুক্তির শর্ত।
অন্যদিকে ইসরায়েলেরও প্রতিশ্রুতি ছিল, তাদের সব বাহিনী লেবানন থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনও দক্ষিণ লেবাননের পাঁচটি অবস্থানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অবস্থান করছে।
ইসরায়েলের অবস্থান পরিষ্কার হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা হামলা বন্ধ করবে না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির একদিন পর ২৮ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন মাসের শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২৫০ জন, আহত হয়েছেন অন্তত ৬০৯ জন।
এই অবস্থার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আবারও সক্রিয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই একজন মার্কিন দূত বৈরুতে পৌঁছাবেন। তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বসে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়ে আলোচনা করবেন।
তবে হেজবুল্লাহ ইতোমধ্যে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, নভেম্বরের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হবে না। বরং দলটি এই প্রস্তাবকে “আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন ইসরায়েলকে এ ধরনের একতরফা আগ্রাসন থেকে বিরত রাখে। তার মতে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ লেবাননের ভেতরের “সংবেদনশীল ও জটিল একটি ইস্যু”, যেটি বাহ্যিক চাপের মাধ্যমে নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে।
উত্তপ্ত সীমান্ত, প্রতিদিন বাড়তে থাকা লাশের সংখ্যা আর ভাঙা চুক্তির নীরব কফিন- সব মিলিয়ে লেবাননের আকাশে যুদ্ধবিরতির ছায়া এখন অনেকটাই ম্লান।
পড়ুন: নিরস্ত্রীকরণ না হলে লেবাননে শান্তি ফেরার সুযোগ নেই: ইসরায়েল
এস/


