বেশ কিছুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলার মাধ্যমে গত ১৩ জুন শুরু হয় এই যুদ্ধ। তবে কেবল ইরান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশই হয়ে উঠেছে ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু। কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট বা এসিএলইডির তথ্য বলছে, গত ২০ মাসে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত ইসরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরানে মোট ৩৫ হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। এই হামলাগুলোর পেছনে রয়েছে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলন্দাজ ইউনিট। বহু ক্ষেত্রে ঘটানো হয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ। ইসরায়েলের এসব হামলা প্রমাণ করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেন ইসরায়েলের চোখের কাাঁটা। আলজাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
সবচেয়ে বেশি হামলা চালানো হয়েছে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে, যার সংখ্যা ১৮ হাজারেরও বেশি। এরপর লেবাননে ১৫ হাজার ৫০০এর বেশি, সিরিয়ায় ৬১৬, ইরানে ৫৮ এবং ইয়েমেনে ৩৯টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
শুধু প্রতিবেশী দেশেই নয়, ইসরায়েল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের ইয়েমেনও রক্ষা পায়নি ইসরায়েলি হামলা থেকে। দূরপাল্লার এই অভিযানের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত এফ-১৫, এফ-১৬ এবং সর্বাধুনিক স্টেলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। নজরদারি ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার জন্য ড্রোনের ওপরও ইসরায়েল ব্যাপক নির্ভরশীল।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে গাজায়। ইসরায়েল টানা ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অঞ্চলটিতে চালিয়েছে বোমাবর্ষণ, অবরোধ এবং স্থল অভিযান। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গাজায় অন্তত ৫৬ হাজার মানুষ নিহত এবং এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। বহু মানবাধিকার সংস্থা একে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।
এছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলছে জমি দখল ও সামরিক দমনপীড়ন। ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে গত ২০ মাসে অন্তত এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
লেবাননের সঙ্গেও থেমে নেই সংঘর্ষ। হিজবুল্লাহর সঙ্গে ১৪ মাস ধরে চলা সীমান্ত সংঘর্ষে ১৩ হাজার ৬০০টি হামলার মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি চালিয়েছে ইসরায়েল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম।
সিরিয়ায়ও ব্যাপকভাবে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির বিমানঘাঁটি, যুদ্ধবিমান ও কৌশলগত অবকাঠামোগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তিন থেকে চার দিন পরপর সেখানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে তেল আবিব। লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দর, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। গাজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে হুতি গোষ্ঠী ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে যার প্রতিক্রিয়ায় আসে এই আঘাত।
সবশেষ, ইরানের অভ্যন্তরেও সরাসরি হামলায় নেমেছে ইসরায়েল। ১৩ জুনের বিমান ও ড্রোন হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয় ইরানের সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রাগার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো।
একবিংশ শতকের এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েল কেবল যুদ্ধ করছে না, বরং গোটা অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আঞ্চলিক বিস্তৃতি মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করছে।
এনএ/


