১০/০২/২০২৬, ১৮:২২ অপরাহ্ণ
26 C
Dhaka
১০/০২/২০২৬, ১৮:২২ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

রয়টার্সের প্রতিবেদন: অল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রী পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতায় শফিকুর রহমান

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শফিকুর রহমান এখন আলোচনার কেন্দ্রে। দাড়িওয়ালা মুখ আর সাদা পোশাকে তার ছবি ঢাকার বিভিন্ন পোস্টার ও বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে, যেখানে ভোটারদের আহ্বান জানানো হচ্ছে, আসন্ন বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দেশের প্রথম ইসলামপন্থি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পক্ষে ভোট দিতে। ৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জামায়াতে ইসলামী দলের আমির অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় অচেনা এক নাম থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মূলত ইসলামপন্থি মহলেই পরিচিত শফিকুর রহমান এখন জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে। ধারণা করা হচ্ছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট এবারের নির্বাচনে তাদের সাবেক মিত্র ও বর্তমান ফ্রন্টরানার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে।

বহু প্রতিক্ষার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে হতে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে জেন জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের প্রথম নির্বাচন এটি। বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৯১ শতাংশ মুসলিম, যা এ দেশকে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর একটি করে তুলেছে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ রয়েছে।

জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফলের দিকে এগোচ্ছে। এই সম্ভাবনা মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থি দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়। কারাবন্দি করা হয় শীর্ষ জামায়াত নেতাদের, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের দায়ে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়, দলটিকে নিষিদ্ধ করে কার্যত পাঠানো হয় আন্ডারগ্রাউন্ডে। শফিকুর রহমান নিজেও ২০২২ সালে নিষিদ্ধ একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং ১৫ মাস কারাভোগ করেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দেয়। ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করে। ২০২৫ সালে আদালত দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, ফলে দীর্ঘদিন গোপনে বৈঠক করা দলটি আবার প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসে।

এরপর দ্রুত সংগঠিত হয় জামায়াত। তারা দাতব্য কার্যক্রম ও বন্যা ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে। সাদা দাড়ি ও সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে শফিকুর রহমান এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান চরিত্রে পরিণত হন। ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের আওয়াজ তোলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু বারবার তা দমন করা হয়েছে। (গণ-অভ্যুত্থানের পর) আমরা আবারও সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।’

চিকিৎসক পরিবার থেকে রাজনীতির মঞ্চে
১৯৫৮ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মৌলভীবাজার জেলায় জন্ম নেয়া শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় একটি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনে। পরে তিনি জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে তিনি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তিনি দলের আমির নির্বাচিত হন।

তার স্ত্রী আমিনা বেগম ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তিনিও একজন চিকিৎসক। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলেও চিকিৎসক পেশায় যুক্ত। শফিকুর রহমান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট জেলায় একটি পারিবারিক মালিকানাধীন হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

ঢাকার অনেকেই বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে তারা তার পূর্ণ নামটিও খুব একটা জানতেন না। এটি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে এক বড় পার্থক্য। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান বর্তমানে শীর্ষ পদে লড়াই করছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, দুই ‘রহমান’-এর মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।

জামায়াত তাদের নেতাকে একজন বিনয়ী ও আন্তরিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরে, যিনি সরলতা ও সহজ-সরল জীবনের ভিত্তিতে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংযত জীবনযাপন করেন।

রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরের এক মাসে বাংলাদেশে কোনো দৃশ্যমান নেতা ছিল না। তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসনে ছিলেন। শফিকুর রহমান সারা দেশ ঘুরেছেন, গণমাধ্যমের মনোযোগ পেয়েছেন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি একজন অগ্রণী প্রার্থী হয়ে উঠেছেন।’

নির্বাচনি প্রচারে তার বক্তব্য অনেক ভোটারের কাছে সাড়া ফেলেছে। তিনি জামায়াতকে ইসলামী মূল্যবোধনির্ভর, পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। গত ডিসেম্বরে দলটি জেন জি-সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, যা তরুণ ও তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

এদিকে সারা দেশে ‘গেম অব থ্রোনস’ থেকে অনুপ্রাণিত পোস্টার দেখা যাচ্ছে, যেখানে শফিকুর রহমানের ছবির পাশে লেখা—“দাদু আসছে”। জামায়াতের তুলনামূলক মধ্যপন্থি মুখ হিসেবে শফিকুর রহমানকে দেখেন কেউ কেউ। দলটির ভাবমূর্তি নরম করতে সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও সামাজিক ন্যায়ের ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। এছাড়া সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান আচরণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

তবে নারীদের বিষয়ে তার বক্তব্য ঘিরে বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। দলটি কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। শফিকুর রহমান বলেছেন, নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করা উচিত নয়, যাতে তারা পারিবারিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একাউন্ট থেকে পাস্ট করা হয়, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেয়া এক ধরনের “বেশ্যাবৃত্তি”। এই মন্তব্যের পর বহু মহল থেকে প্রতিবাদ আসে। তবে, জামায়াত দাবি করে, ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নমনীয়, আমরা যুক্তিসঙ্গত। আমাদের নীতির ভিত্তি ইসলামী মূল্যবোধ, কুরআনের মূল্যবোধ। কোরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, এটি সমগ্র সৃষ্টির জন্য।’

সূত্র: রয়টার্স

পড়ুন: ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন সাধারণ ভোটাররা

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন