রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভাইরাসজনিত রোগ জলাতঙ্কের টিকা (র্যাবিস ভ্যাকসিন) ফুরিয়ে গেছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর থেকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে ফার্মেসী থেকে ক্রয় করে আনলে টিকা দিচ্ছেন হাসপাতালের কর্মীরা। এদিকে, সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাজারেও ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সংকট প্রকট।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন শেষ হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় ১৮ ডিসেম্বর থেকে বিগত একমাস ১০ দিন ধরে সরকারভাবি ভ্যাকসিনটি দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে র্যাবিস আক্রান্ত রোগীরা বাহিরের ফার্মেসী থেকে টিকা ক্রয় করে হাসপাতালে এসে শরীরে পুশ (প্রয়োগ) করাতে পারছেন।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসজুড়ে ৩৭৯ জন রোগী রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন। ১ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৭ জন রোগী ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। তবে ১৯ ডিসেম্বর থেকে চলতি মাসের এ পর্যন্ত সময়টাতে কতজন রোগী বাহিরে থেকে ভ্যাকসিন এনে হাসপাতালে পুশ করিয়েছেন সেটির নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রাঙামাটি জেলায় জলাতঙ্কের রোগীর মধ্যে কুকুরের কামড়ের চেয়েও বিড়াল, ইঁদুর, বেজিসহ অন্যান্য প্রাণীদ্বারা আক্রমণের শিকার রোগী সংখ্যা বেশি বলছেন চিকিৎসকরা।
সাম্প্রতিকসময়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘সাময়িক সময়ের জন্য কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ সংকটের কারণে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন বিতরণ/প্রদান বন্ধ আছে। সেক্ষেত্রে বাহিরের ফার্মেসি থেকে ক্রয় করে এনে দিলে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ সমস্যার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মরত নিখিল চাকমা বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বর মাসে ৩৭৯ জন এবং ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৭ জন রোগীকে হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। তবে যারা বাহিরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে হাসপাতালে পুশ করাচ্ছেন, তাদের নির্দিষ্ট তথ্য নেই। হাসপাতাল থেকে যেসব টিকা দেয়া হয় সেগুলোর রেজিস্ট্রার থাকে। এখন সেবা কার্যক্রমের আওতায় রোগীদের পুশ করে দেয়া হচ্ছে।,
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশব্যাপী কেন্দ্রীয়ভাবে জলাতঙ্ক টিকা বা র্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ করে থাকে। সরকারিভাবে ‘র্যাবিক্স-ভিসি’ নামক ভ্যাকসিনটি সরবরাহ করা হলেও এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলো বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সরকারের কাছে সরবরাহ ছাড়াও বিভিন্ন ফার্মেসীতে ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করে থাকে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি। সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাজারেও ভ্যাকসিনটির সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।
ভ্যাকসিন প্রদান কাজে সংশ্লিষ্টরা জানান, র্যাবিক্স-ভিসি ভ্যাকসিনটি মাংসপেশীতে প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি ভায়াল এক ডোজ হিসেবে একজন রোগীকে প্রয়োগ করা যায়। তবে চামড়ার ভেতরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি ভায়ালে ১০টি ডোজ থাকে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন একটি ভায়াল ৪-৫ রোগীকে দেয়া সম্ভব। হাসপাতালে চামড়ার ভেতরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়ে থাকে আর সাধারণত ফার্মেসী বা বাহিরে থেকে সরবরাহ নিলে সেগুলো মাংশপেশীতে প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে বিনামূল্যের বদলে ভ্যাকসিন ক্রয়েও বাড়তি খরচ বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন রোগীরা।
এদিকে, সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় রোগীদের ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি ভ্যাকসিন প্রয়োজন হচ্ছে। হাসপাতালে ৪-৫ জন রোগীকে এক ভায়াল থেকে প্রয়োগ করা গেলেও বাহিরে প্রতিজনেরই একটি লাগছে। যে কারণে বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। রাঙামাটি জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরূপার প্রদীপ ড্রাগহাউজ, টিপু ফার্মেসীসহ বেশ কয়েকটি ওষুধ বিক্রয়কারী দোকানে খোঁজ নিয়েও ভ্যাকসিনটি পাওয়া যায়নি। ফার্মেসীর লোকজন জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ দিতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের রাঙামাটি রিজিয়নের এরিয়া ম্যানেজার মো. নাজিউল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী র্যাবিক্স-ভিসি ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা সংকট রয়েছে। চলতি মাসেই আমরা দুই দফায় ৪৫০টি ভ্যাকসিন পেয়েছি, যেগুলো রাঙামাটি সদর, মাইনি-মারিশ্যা ও চট্টগ্রামের রানীরহাটের ফার্মেসীগুলোকে সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমান বাজারে মাসে ১ হাজারটি ভ্যাকসিনও সরবরাহ করা হবে।’
জানতে চাইলে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. শওকত আকবর খান বলেন, ‘২০২৫ সালে সরকারিভাবে বছরজুড়ে সাপ্লাই দিতে পেরেছি। র্যাবিস ভ্যাকসিন সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করে এবং আমরা চাহিদা অনুযায়ী নিয়ে আসি। ২০২৫ সালের শেষদিকে এসে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকে ভ্যাকসিন শেষ এবং আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে ব্যর্থ হন। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করে যাচ্ছি।’
আরএমও আরও বলেন, ‘রাঙামাটি জেলায় কুকুরের কামড়ের চেয়েও বিড়াল, ইঁদুর, বেজি দ্বারা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। পাগলা কুকুরের সংখ্যা কম থাকায় কুকুর দ্বারা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও কম। আমাদের বছরজুড়ে ৫ হাজার ভ্যাকসিনের চাহিদা রয়েছে। গত কয়েকদিন আগে আমরা এ সংক্রান্ত চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। সরবরাহ পাওয়া মাত্র সেবা দিতে পারব। হাসপাতালে আমরা একটা ভায়াল দিয়ে প্রায় চারজন রোগীকে ভ্যাকসিন দিতাম। এই মুহুর্তে দুই-তিন রোগী যদি একটি ভায়াল আনেন তাহলে আমরা একসঙ্গে তাদেরকে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে দিচ্ছি। এতে করে রোগীদের কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক সাশ্রয় হয়।
পড়ুন: টাঙ্গাইলে ৮টি আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬০
দেখুন:ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেলে পদ্মা নদীর ভাঙনে জমি, বসত ঘর |
ইম/


