সমাজের আয়না হচ্ছেন শিল্পীরা। কিন্তু তারা যখন রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তখন সেই আয়নায় দাগ পড়ে। হারিয়ে যায় শিল্পীসত্তা। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে বহু নামকরা শিল্পী রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়েছেন। কেউ সরকারবিরোধী মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছেন, কেউ আবার দলীয় কোন্দলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ পরিস্থিতি তাদের ক্যারিয়ার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অনেকে শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দী।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর ক্ষমতার পালাবদলে পরিবর্তন হতে দেখা গেছে অনেক কিছু। দেশের বিভিন্ন সেক্টরের মতো বিনোদন জগৎও এ নিয়ে অস্থির সময় পার করছে।

প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয় ও আওয়ামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা থাকায় অনেক শিল্পী পড়েছেন সংকটে। বিশেষ করে যারা প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার গণহত্যায় সমর্থন দিয়েছেন, আন্দোলন চলাকালীন ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তারাই আজ বিপাকে। যদিও এদের কেউ কেউ ভোল পালটে বর্তমান স্রোতের সঙ্গে মিশে গেছেন, তবু বড় অঙ্কের শিল্পী কিন্তু আড়ালে। কেউ কেউ হয়েছেন গ্রেফতার। মিডিয়ার ইতিহাসে শিল্পীদের এ করুণ দশা এর আগে আর ঘটেনি।
কারণ, শিল্পীদের রাজনীতি চর্চা করাটা নতুন নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমন চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু আওয়ামী ঘনিষ্ঠ শিল্পীরা লেজুড়বৃত্তি রাজনীতিতে এতটাই বুঁদ ছিলেন যে, ভুলে গিয়েছিলেন শিল্পের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ। দলকানা হিসাবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার লোভে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে আজ অনেককেই। আজ এদের অনেকের হাতেই নেই কোনো কাজ। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নেই সরব উপস্থিতি। প্রকাশ্য রাজনীতি চর্চার কারণে এদের অনেকেই হচ্ছেন হামলা-মামলার শিকার, আবার কেউ হচ্ছেন নিন্দিত, ক্যারিয়ার তুঙ্গে।

সম্প্রতি প্রায় দুই ডজনের বেশি শিল্পীর নামে হয়েছে মামলা, আবার অনেকেই গ্রেফতার হয়ে রয়েছেন কারাগারে। আসাদুজ্জামান নূর, মামুনুর রশীদ, সুবর্ণা মুস্তাফা, মমতাজ বেগম, চঞ্চল চৌধুরী, ফেরদৌস, অরুণা বিশ্বাস, শামীমা তুষ্টি, মেহের আফরোজ শাওন, নুসরাত ফারিয়া, চিত্রনায়ক রিয়াজ, জায়েদ খান, অপু বিশ্বাস, আশনা হাবিব ভাবনা, আজিজুল হাকিম, নিপুণ, শমী কায়সার, সাজু খাদেম, জ্যোতিকা জ্যোতি, সোহানা সাবা, ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর, তানভীন সুইটি, জাকিয়া মুন, সাইমন সাদিক, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান, সিদ্দিকুর রহমানসহ অনেকেই। এদিকে জনগণের রোষানলে পড়ে হামলার শিকার হয়েছেন এমন কয়েকজন শিল্পীও রয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও অনেক শিল্পী ব্যক্তিগত ইস্যু ঘিরেও মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়েছেন। যা কমিয়ে দিচ্ছে কাজের গতি। ছিটকে পড়ছেন মিডিয়া থেকে। এভাবেই রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক হয়রানি এবং ব্যক্তিগত দুর্ভোগ মিলে মিডিয়া থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন অনেক প্রতিভাবান শিল্পী। তাতে করে নাটক কিংবা সিনেমায় এখন দেখা দিচ্ছে শিল্পী সংকট। এভাবে চলতে থাকলে দেশীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন তারকাশূন্য হয়ে পড়বে। তাই শিল্পীদের শিল্পকর্মেই বেশি মনোনিবেশ করাটাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


