বিজ্ঞাপন

রাজনীতি-ঠিকাদারিতে ব্যস্ত শিক্ষক: ক্লাস নেন ‘প্রক্সি শিক্ষক’

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় গুমুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক মো. রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে অনুপস্থিত থেকে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। তার পরিবর্তে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নাতনি ‘রূপা’। পাশাপাশি খোদ স্কুলের জমি বিক্রি করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. রুহুল আমিন খাতায়-কলমে শিক্ষক হলেও বাস্তবে তিনি স্কুলে যান না বললেই চলে। তার অনুপস্থিতিতে ‘রূপা’ নামের এক তরুণী নিয়মিত ‘প্রক্সি শিক্ষক’ হিসেবে ক্লাস নেন। জানা গেছে, রূপা ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আ. হান্নানের নাতনি।

শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছে, রুহুল আমিন স্যার ‘মাঝে মাঝে’ আসেন। অন্যদিকে রূপা ম্যাডাম নিয়মিত আসেন এবং রূপা ম্যাডামই তাদের বাংলা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান এবং ইংরেজি বিষয়ের ক্লাস নেন।

গত ২৯ মার্চ (রবিবার) সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলের খাতায় ৮৮ জন শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত ছিল মাত্র নয় জন। প্রক্সি ক্লাসের চেয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্কুলের জমি আত্মসাতের।

প্রাপ্ত দলিল অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রধান শিক্ষক আ. হান্নান, জমি দাতা আ. মান্নান এবং সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন যোগসাজশ করে স্কুলের জায়গা স্থানীয় ‘মনসুর আহমেদ মহিলা কলেজের’ কাছে বিক্রি করে দেন এবং কলেজের নামে নামজারিও সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে জালিয়াতি ঢাকতে ওই জমি পুনরায় জমি দাতা আ. মান্নান ও তার স্ত্রী হেলানা আক্তারের নামে নয় লক্ষ পাঁচ হাজার টাকায় কিনে নেওয়া হয়। এই দলিলে প্রধান সাক্ষী ছিলেন শিক্ষক রুহুল আমিন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি- এমন দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম।

তবে সিরাজুল ইসলামের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছরের ২২ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে বারহাট্টা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবরে প্রেরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে স্কুলের জমি সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সে চিঠিতে সাবেক ইউএনও মো. খবিরুল আহসান উল্লেখ করেন, প্রধান শিক্ষক আব্দুল হান্নান ও আব্দুল মান্নান কর্তৃক গুমুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের জমি দালিলিকভাবে বিক্রি করা হয়েছে। তদন্তে বিদ্যালয়ের দখলে ০.৩০ (ত্রি শতাংশ) একর জমি পাওয়া গেলেও, জাল-জালিয়াতির কারণে কাগজপত্রে বিদ্যালয়ের স্বত্বাধিকার বিনষ্ট হয়েছে।

এলাকাবাসী অনিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সাইকুল মিয়া বলেন, শিক্ষক রুহুল আমিন নিয়মিত স্কুলেই আসেন না। ঠিকাদারিসহ অন্যান্য কাজে রুহুল আমিন নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। শিক্ষার মান নিয়ে হতাশ হয়ে তিনি তার ছেলে-মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করেছেন। সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম খোকন নিশ্চিত করেন, রুহুল আমিন প্রভাব খাটিয়ে প্রক্সি দেওয়াচ্ছেন। গ্রামের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ‘প্রক্সি শিক্ষকে’র সত্যতা পাওয়া যাবে। ওই বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র সুমন জানান, রুহুল আমিন স্যার আগে থেকেই অনিয়মিত ছিলেন, আর এখন একেবারেই স্কুলে আসেন না।

জানা যায়, শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর অঙ্গসংগঠনের সাথে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বারহাট্টা থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা। এছাড়াও তিনি ‘রুহুল-জাকির-হাবিব ঐক্য সোসাইটি’ নামের একটি প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি চাকুরি বিধি লঙ্ঘন করে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করার। স্থানীয়দের দাবি- এসব প্রভাব খাটিয়েই তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

সহকারী শিক্ষক মো. রুহুল আমিন প্রক্সি দেওয়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি নিয়মিত স্কুলে আসেন। বড় শ্রেণির ক্লাসগুলো নেন- তাই শিক্ষার্থীরা ভূল বলেছে। তার মতে, রূপা মাঝে মাঝে শখ করে ক্লাস নেয় এবং স্কুলের দাপ্তরিক ও কম্পিউটারের কাজে সাহায্য করে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

প্রধান শিক্ষক মো. আ. হান্নান তিনিও প্রক্সির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, নাতনি রূপা বাড়িতে প্রাইভেট পড়ায়, স্কুলে মাঝে মাঝে দু-একদিন পড়িয়েছে মাত্র। ছুটির পর স্কুল খোলায় উপস্থিতির এমন দৈন্যদশা বলে তিনি দাবি করেন।

প্রক্সি শিক্ষক রূপা’র সাথে সাক্ষাত ও কথা বলতে প্রধান শিক্ষক কর্তৃক সরবরাহকৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) জিয়াউল হক জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষকের কোনো আইনি সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের প্রমাণ দেখালে তিনি বিষয়টি আমলে নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং প্রক্সির বিষয়টি প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতিবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

পড়ুন: আরও একটি পদ্মা সেতুসহ আসছে ৩ মেগা প্রজেক্ট

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন