কথা না শুনলেই অধিনস্থদের উপর স্বেরাচারীতা, শিশু কিশোরীদের অমানবিক নির্যাতন, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা, শিশুদের জন্য সরবরাহ করা মালামাল, কাপড় ও খাবার বিক্রিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বরত তত্ত্বাবধায়ক মার্জিয়ার বিরুদ্ধে। গত ৯ বছর ধরে এমন নানা অনিয়ম করলেও মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না অধিনস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীরা। কারন, অতীতে যারা সাহস করে কেউ মুখ খুলেছেন তারা শিকার হয়েছেন বদলির, শিক্ষার্থীরা বহিষ্কারের আর দাড়োয়ানকে চাকুরীচ্যুত করা মতো ঘটনা। ফলে এখন পর্যন্ত দাপুটের সাথেই বহাল রয়েছেন মার্জিয়া।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার ঢাকা বাইপাস সড়কের পাশে ১শত আসনের একটি সরকারি শিশু পরিবার ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৪ সালে। এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা পথশিশু, হতদরিদ্র পরিবারের বালিকা শিশু ও এতিমদের নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। পদাধিকার বলে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও এ প্রতিষ্ঠানটির দেখভাল করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করেন একজন উপ তত্ত্বাবধায়ক। কাঞ্চন পৌর সরকারি শিশু পরিবারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মার্জিয়া বেগম। তার অত্যাচার,নির্যাতন, বরাদ্দ নয় ছয় ও স্বেচ্চাচারিতায় অতীষ্ঠরা এবার মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
সূত্র জানায়, কাঞ্চন পৌরসভার সরকারী শিশু পরিবারের কাগজে কলমে ১শত শিক্ষার্থী বা এতিমদের সরকারি সুযোগ সুবিধায় আবাসিক লালন পালনের ব্যবস্থা দেখালেও বাস্তবে রয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ জন। শুধুমাত্র কোন কর্মকর্তা পরিদর্শনে এলে পাশের মকতব, বা হেফজখানার শিক্ষার্থীদের উপহার দেয়ার কথা বলে একদিনের জন্যে শত আসন পুরন করে দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে শিশুদের সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ, খাবারের তালিকায় নিন্ম মানের খাবার ও শিশুদের দিয়ে পরিবারের কাজ করানো, এমনকি বালিকাদের আবাসিক এলাকায় পুরুষ নিয়ে বসবাস নিষিদ্ধ থাকলেও তার স্বামী, কলেজ পড়ুয়া ছেলে,পুরুষ আত্নীয় স্বজনকে নিয়মিত প্রবেশ করানোর।
রূপগঞ্জ শিশু পরিবারে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক আফরোজা আক্তার জানান, তার সাথে মার্জিয়ার করা নানা অনিয়ম নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। শিক্ষার্থীদের দিয়ে রান্না করানোসহ তাদের নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় তাকে বদলি করার হুমকী দেয়। এসব নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত জানালে তা সংবাদকর্মীদের কাছে দৃষ্টিগোঁছর হয়। তা নিয়ে সাংবাদিকরা মার্জিয়ার কাছে বক্তব্য চাইলে উল্টো আফরোজাকে বদলি করিয়ে দেয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মার্জিয়ার নির্দেশের বাহিরে গেলেই বদলি করানো হয়। বাদশা নামের একজন দাড়োয়ান তার কথামতো ভেতর থেকে মালামাল সরাতে রাজি না হওয়ায় তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করে দেয়।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানায়, খাবারে মেনু অনুযায়ী শিশুদের খাবার দেওয়া হয় না। একজন বাবুর্চি থাকা স্বত্বেও বালিকাদের দিয়ে রান্না করানো হয়। ড্রেনেজ, পয়োনিষ্কাশন, ঝাড়ু, লাকরী প্রস্তুতসহ নানা কাজ করতে বাধ্য করা হয়। আবার মাসিক টাকার বিনিময়ে এতিম না হলেও এতিম দেখিয়ে শিশুদের সরকারি সুযোগ সুবিধা দেয়ার নাম করে নিজেই আত্মসাৎ করে মার্জিয়া।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক কর্মকর্তা জানান, শিশু পরিবারটি সরকারী হওয়ায় আর ইউএনও ব্যস্ত থাকার সুযোগে ব্যাপক অনিয়ম করে থাকে। অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। পাশাপাশি জামাকাপড়-জুতা-স্যান্ডেল দেওয়া হয় না।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রূপগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) দিনের পর দিন চলেছে কর্মকর্তাদের চরম স্বেচ্ছাচারিতা। পান থেকে চুন খসলেই শিশুদের ওপর নেমে আসে অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের খড়গ্। শিশুদের জন্য সরকারি বরাদ্দের মাছ-মাংস চলে যায় মার্জিয়ার বাসায়। প্রতিষ্ঠানের গাছে ধরা আম-কাঁঠালেও এতিমদের থাকে না তাদের অধিকার। লোকচক্ষুর অন্তরালে এভাবেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন উপতত্ত্বাবধায়ক মার্জিয়া।
নিবাসী শিশুদের অভিযোগ, শিশু পরিবারে দৈনিক খাবার তালিকায় যে খাবার সরবরাহের কথা, তা খেতে দেওয়া হয় না। বিপরীতে নিুমানের খাবার অল্প পরিমাণে দেওয়া হতো। গরু বা খাসির মাংস খাবার তালিকায় থাকলেও বিশেষ দিন ছাড়া সেগুলো রান্না করা হয় না বা খেতে দেওয়া হয় না। এছাড়া প্রতিদিন মোটা চাল ও পানির মতো পাতলা ডাল রান্না করে দেওয়া হয়। খাবার নিয়ে প্রতিবাদ করলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপ তত্ত্বাবধায়ক মার্জিয়া মুঠোফোনে কথা বলতে রাজি না হলে সরাসরি দেখা করতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে নারী বালিকা রয়েছে অযুহাত দিয়ে ফটক খুলেননি। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগ করতে চাইলেও তিনি যোগাযোগ করেননি।
চাকুরীচ্যুত দাড়োয়ান (ছদ্মনাম বাদশা) বলেন, রূপগঞ্জের এ প্রতিষ্ঠানে ৬ বছর ছিলাম। এখানে এতিম ও অসহায় বালিকারা থাকেন, তাদের নিম্নমানের খাবার দেয়া হয়। এছাড়া কিশোরীদের জামা-কাপড়সহ মশারি, বালিশ-তোষক নির্ধারিত সময়ে পরিবর্তনের কথা থাকলেও তা করা হয় না। দেয়া হয় না ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ভাড়া আত্মসাৎ ও ইফতারি কম দেয়া হয়। শুধুমাত্র ইউএনও বা সমাজসেবার বড় কর্মকর্তারা এলে পরিপাটি করে উপস্থাপন করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি শিশু পরিবারে ১০০ আসন রয়েছে। আমি সভাপতি হিসেবে নিয়মিত দেখাশুনা করি। আমার জানামতে, শিশু পরিবারের নিবাসীদের জন্য সপ্তাহে দুই দিন মাংসসহ প্রতিদিন খাবারের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দ থাকে। আর শিশুদের দিয়ে অনিয়ম করে থাকলে তা খতিয়ে দেখবো।
পড়ুন: বিমান বিধ্বস্ত : লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীতে এনসিপির পদযাত্রা স্থগিত
দেখুন: মিরপুর বাঙলা কলেজের সামনে বিএনপির পদযাত্রায় হামলা
ইম/


