ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জমে উঠেছে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর এই আসনে সরব হয়ে উঠেছে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ নানা রাজনৈতিক দল। তবে ঐক্যহীন বিএনপির ভেতরে কোন্দলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে মাঠে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী দলগুলো। রামগঞ্জ পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২,৭৭,৭৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৪২,৩২৬ এবং নারী ভোটার সংখ্যা ১,৩৫,৪৩৪ জন। নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে প্রার্থীরা এখন তৃণমূলে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে এলাকায় অবস্থান জোরদার করেছেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগ, কেউ সাংগঠনিক তৎপরতায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। বর্তমানে আসনটিতে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ নানা দলের নেতারা সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, ইসলামী আন্দোলনের জাকির হোসেন পাটওয়ারী, জামায়াতের প্রার্থী নাজমুল হাসান পাটওয়ারী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার পুত্র মাশফিকুল হক জয়, স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের এমডি জহিরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ হারুন, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী, ইসলামী আন্দোলনের জাকির হোসেন পাটওয়ারী এবং এবি পার্টির আনোয়ার হোসেন সক্রিয়ভাবে মাঠে আছেন।
এদের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম। তিনি দলীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন। মাহবুব আলম বলেন, আমরা চাচ্ছি আগে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি। তারপর হবে নির্বাচনের কার্যক্রম। আপাতত আমরা লক্ষ্মীপুরসহ সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
পালাবদলের রাজনীতি ও সংসদীয় ইতিহাস লক্ষ্মীপুর জেলা ১৯৮৪ সালে নোয়াখালী থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে তার আগেই ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মোহাম্মদ আবদুর রশিদ এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ের রাজনীতিতে পরিবর্তনের ঢেউ বয়ে যায় লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির আ ন ম শামছুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (রব) এম এ গোফরান, ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ সালে বিএনপির জিয়াউল হক জিয়া, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আহমেদ, ২০০৮ সালে পুনরায় বিএনপির নাজিম উদ্দিন আহমেদ, এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটভুক্ত তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল নৌকা প্রতীকে জয় পান। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আনোয়ার হোসেন খান এমপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে আসনটি কখনো বিএনপি, কখনো জাপা বা আওয়ামী লীগের হাতে গেছে। এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে জমে উঠেছে মাঠের লড়াই।
বিএনপিতে বিভক্তি, মাঠে একাধিক প্রার্থী বিএনপির হয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ হারুন, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী, প্রয়াত প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার ছেলে মাশফিকুল হক জয়, এবং স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম।
তবে তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি এখন অন্তত ছয় ভাগে বিভক্ত। জ্যেষ্ঠ নেতাদের কোন্দল নিচে পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে। একাধিক নেতার মনোনয়ন প্রত্যাশা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে দলে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।
ইয়াছিন আলী বলেন, ৩১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা মাঠে কাজ করছি। নেতাকর্মীরা একতাবদ্ধভাবে পাশে আছে। অন্যদিকে হারুনুর রশিদ জানান, আগে মনোনয়ন পেয়েছিলাম, পরে দলের সিদ্ধান্তে সরে দাঁড়িয়েছি। এবারও মনোনয়নের বিষয়ে আমি আশাবাদী।
ইসলামী দলগুলোর সক্রিয়তা ভোটের মাঠে দৃশ্যমান তৎপরতা চালাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা সহ-সভাপতি ও সম্ভাব্য প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। ৫৪ বছরেও তা পূরণ হয়নি বলেই ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এখন আমাদের সামনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। আমি চাই সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত, সুস্থ রাজনীতির রামগঞ্জ গড়তে যেখানে জনগণের আমানত তাদের কাছেই থাকবে। ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও রামগঞ্জ উপজেলা আমির নাজমুল হাসান পাটওয়ারী বলেন, এই মুহূর্তে জামায়াত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা আমাদের দিকে ঝুঁকছে।
আওয়ামী লীগে নিস্তব্ধতা, মাঠে নেই শক্ত অবস্থান সাবেক সরকারদলীয় এমপি আনোয়ার হোসেন খান বর্তমানে এলাকায় তেমন সক্রিয় নন। দলীয় কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে এই আসনটি আওয়ামী লীগ নিজেদের দখলে রাখে। তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
অন্যান্য প্রার্থীরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম, এবি পার্টির আনোয়ার হোসেন, জাতীয় পার্টির মাহমুদুর রহমান মাহমুদসহ আরও অনেকে। মাহবুব আলম বলেন, আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নির্বাচনের পক্ষে। সাংগঠনিকভাবে সারাদেশে কাজ করছি। তবে এ আসন থেকে তার ভাই তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও নির্বাচন করার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে রামগঞ্জে বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার সময়ে দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন হলেও এরপর থেকে তেমন বড় কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি- এমনই মত স্থানীয়দের। এ কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে এখনও জিয়ার স্মৃতি, অবদান ও তার পরিবারের প্রতি একটা আবেগ কাজ করে। সেই ধারাবাহিকতায় তার ছেলে মাশফিকুল হক জয়কেও অনেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রাখছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি নিজের বাবার অসমাপ্ত কাজ ও উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে একদিকে যেমন বিএনপির বিভক্তি, অন্যদিকে ইসলামী দলগুলোর সংগঠিত তৎপরতা নির্বাচনী মাঠকে অন্যরকম মাত্রা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এই প্রতিযোগিতাকে আরও উন্মুক্ত করে তুলেছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মাঠ ততই গরম হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

