মুসলিমদের জন্য পবিত্র আচার হলো হজযাত্রা। এবছর এই পবিত্র হজযাত্রা শুরু হচ্ছে ৪ জুন থেকে, যা চলবে ৯ জুন পর্যন্ত। এবার হজ পালনে কাবার উদ্যেশ্যে রওনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ মুসলিম।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে হচ্ছে হজ পালন। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম একজন মুসলিমের জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ হিসেবে ধরা হয়।
‘হজ’ শব্দটির আরবি মূল অর্থ হলো ‘নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যাত্রা’। এই যাত্রা কেবল ভ্রমণ নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভ, আত্মশুদ্ধি ও পাপমোচনের এক মহা-আধ্যাত্মিক উপলক্ষ। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, কাবা শরিফ নির্মাণ করেছিলেন নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)। পরবর্তীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ১০ হিজরিতে নিজের বিদায়ী হজে এই তীর্থযাত্রার পূর্ণাঙ্গ রীতি ও কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করেন।
হজ প্রতিবছর হিজরি ক্যালেন্ডারের ১২তম মাস ‘জ্বিলহজ্জ’-এর ৮ থেকে ১২ (বা ১৩) তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। কারণ ইসলামি বর্ষপঞ্জি চন্দ্রচক্র নির্ভর, তাই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে হজের তারিখ প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ দিন আগে চলে আসে।
পবিত্র হজের শুরু হয় ইহরাম পরিধান ও নিয়ত গ্রহণ দিয়ে। পুরুষরা দুটি সেলাইহীন কাপড় পরে এবং নারীরা সাধারণ শালীন পোশাক পরে নির্দিষ্ট নিয়মে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। প্রথম দিন, অর্থাৎ ৮ জ্বিলহজ্জে, হজযাত্রীরা মিনায় যান এবং রাত কাটান। পরদিন ৯ জ্বিলহজ্জে তাঁরা উপস্থিত হন আরাফাতের ময়দানে, যেখানে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘ওকুফ’ অনুষ্ঠিত হয়। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন মুসলমানরা।
ওইদিন সন্ধ্যায় তারা মুজদালিফায় গমন করেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। এখান থেকে পরদিন শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করা হয়। ১০ জ্বিলহজ্জে ঈদুল আযহার দিন জামারাতে ‘রমি’ বা শয়তানকে কঙ্কর ছোড়া, পশু কুরবানি, মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটা এবং কাবা শরিফে ‘তাওয়াফুল ইফাদাহ’ বা মূল তাওয়াফ সম্পন্ন করেন হাজীরা।
পরবর্তী দুই বা তিন দিন মিনায় অবস্থান করে তিনটি শয়তানকে কঙ্কর ছোড়ার রীতি পালন করেন হজযাত্রীরা। কেউ কেউ ১২ জ্বিলহজ্জেই হজ শেষ করেন, আবার কেউ ১৩ তারিখ পর্যন্ত মিনায় থেকে যান। হজের সমাপ্তি হয় ‘তাওয়াফুল ওদা’ বা বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে – যা কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে সাতবার চক্কর দেওয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
হজ পালনের প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজযাত্রীরা সাধারণত হালকা লাগেজ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ইহরামের কাপড়, ছাতা, ওজু ও সালাতের সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেন। হজযাত্রীদের মধ্যে প্রখর রোদ ও ভিড়ের মধ্যে হজ পালন করায় মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক।
হজের সমাপ্তিতে আসে ঈদুল আযহা, যা কুরবানির ঈদ হিসেবেও পরিচিত। এটি মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ উৎসব। এই দিনে মুসলমানরা নামাজ আদায় করেন, পশু কুরবানি করেন এবং তা আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করেন। “ঈদ মোবারক” শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনন্দঘন উদযাপন।
হজ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বৈশ্বিক মুসলিম ঐক্য, সমতা ও সাম্যের এক প্রতীক। এখানে জাতি, বর্ণ, ভাষা বা সামাজিক স্তর ভুলে সবাই এক আল্লাহর সামনে এক কাতারে দাঁড়ান, এক পোশাকে, এক নিয়মে। আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের এই মহাযাত্রা মুসলিম জীবনের এক গৌরবময় অভিজ্ঞতা।
হজ যারা সম্পন্ন করেছেন, তাদের জীবনে এটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। আর যারা এই সুযোগ এখনও পাননি, তাদের জন্য হজের বার্তা হতে পারে আত্মসংশোধনের এক মহামন্ত্র। কারণ হজ মানেই ফিরে পাওয়া – নিজের আত্মা, ঈমান এবং স্রষ্টার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক।
পড়ুন: সৌদিতে পৌঁছেছেন ১৫ লক্ষাধিক হজযাত্রী
দেখুন: হজ প্যাকেজ: সরকারি ব্যবস্থাপনায় খরচ ৬ লাখ ৮৩ হাজার
এস


