১৩/০২/২০২৬, ১৫:১৫ অপরাহ্ণ
27 C
Dhaka
১৩/০২/২০২৬, ১৫:১৫ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

শিক্ষা নিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা

মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাথমিক শিক্ষা এনজিওকরণ তথা বেসরকারিকরণের মানসিকতা নিয়ে কাজ করে গিয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা প্রথমত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার নানারকম বদনাম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষকদের সাথে প্রেমিকের অভিনয় করে—মুখে মিষ্টি আশ্বাস, অন্তরে ষড়যন্ত্র—নিয়ে শেষলগ্নে পৌঁছেছেন।

বিজ্ঞাপন

শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়ার গানের একটা লাইন দিয়ে নিবন্ধটি শুরু করছি—

“আমি বুড়ি হলাম তোর কারণে।”

এ দেশের শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী সবকিছু উজাড় করে, তথা নির্বাচন কমিশনের বিধিবদ্ধ আইনের লঙ্ঘন করে জাতিকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। কারো কাছে সরকারের দালাল হয়েছে, কারো কাছে সরকারি কর্মচারী আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে চাকরিচ্যুতির মতো অপরাধ করেছে। কাঙালিনী সুফিয়া যেমন তার জীবন, যৌবন, দেহ–মন দিয়ে বৃদ্ধ বয়সে দুঃখ করে বলছেন—আমি এত কিছু করলাম কার জন্য?

রকারি কর্মচারী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকসহ সকলে আশাবাদী ছিল যে, সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩ মাসের স্থলে ১৮ মাস ক্ষমতায় থেকে শিক্ষাব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়ন করবে। অথচ শিক্ষা ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বকালের অবনতির রেকর্ড স্থাপন করেছে। আওয়ামী সরকারের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ধ্বংসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো কিছুই দৃশ্যমান নয়।

মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাথমিক শিক্ষা এনজিওকরণ তথা বেসরকারিকরণের মানসিকতা নিয়ে কাজ করে গিয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা প্রথমত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার নানারকম বদনাম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষকদের সাথে প্রেমিকের অভিনয় করে—মুখে মিষ্টি আশ্বাস, অন্তরে ষড়যন্ত্র—নিয়ে শেষলগ্নে পৌঁছেছেন

নেতাদের তথা শিক্ষকদের মুখে ও লেখনির মাধ্যমে বলেছি, তিনি আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা এনজিওকরণ তথা বেসরকারিকরণের কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমান শিক্ষকেরা উচ্চশিক্ষিত। অনেকের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না।

তখন আমি তাদের বলেছি—আমি শিক্ষা, জ্ঞান, বিদ্যা, বুদ্ধি ও যোগ্যতায় বড় না হলেও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। দীর্ঘ সময় এনজিও তথা বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে আজকের জীবনের শেষ লগ্নে এসেছি।

এনজিও-বেষ্টিত কনসালটেশন কমিটি—কেহ কেহ পদধূলি ও তোষামোদিতে ব্যস্ত। কেহ কেহ বলে থাকেন, আন্দোলন করে কী হবে? দালালি তথা তোষামোদির ভালোবাসা দিয়েই সবকিছু অর্জন হবে।

না, এটা মোটেই ঠিক নয়। প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের আন্দোলনের ফলে দৃশ্যমান অর্জন না দেখা গেলে অদৃশ্যমান অর্জন হয়েছে।

এবার অদৃশ্যমান অর্জন নিয়ে আলোকপাত করছি। সকলের হয়তো স্মরণ আছে—সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তথা বিশেষ করে ব্র্যাকের একনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক সচিব ফরিদ আহমেদ প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেড, ৮০ শতাংশ প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি, অল্প কিছু সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে তা বাধাগ্রস্ত হয়ে নতুনভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে, যা হলো এনজিও ব্র্যাকের প্রধান ব্যক্তি ড. মনজুর আহমেদের নেতৃত্বে কনসালটেশন কমিটি।

প্রাথমিকের শিক্ষকদের নেতারা অতীতের ইতিহাস জানেন না, জানার আগ্রহও নেই। তাদের মাঝে ময়নামতি ছবির মতো একটা বদ্ধ ধারণা—“চাচায় কইছে দিবে।”

ড. মনজুর আহমেদের নেতৃত্বে কনসালটেশন কমিটির ঝড়ের বেগে শিক্ষা তথা শিক্ষকদের মানোন্নয়ন কল্পে সকল পেশাজীবী, স্টেকহোল্ডার মতবিনিময়, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ ব্যস্ততার মাঝে প্রাথমিক শিক্ষা সমৃদ্ধ না করে ধ্বংস করার কাজে অগ্রসর হতে লাগলো।

সকলের স্মরণে থাকার কথা—কনসালটেশন কমিটির পরামর্শ মোতাবেক সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছিলেন। অর্থ মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে ফেরত পাঠিয়েছেন। আমার জানা তথ্যমতে প্রধান শিক্ষক পদে ৮০ শতাংশ পদোন্নতি চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন, তা অনুমোদন পায়। সহকারী প্রধান শিক্ষকের নগণ্য সংখ্যক পদ অনুমোদন হয়। আন্দোলনের তীব্রতা দেখে মন্ত্রণালয় সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ কার্যকর করা থেকে বিরত থাকে।

কনসালটেশন কমিটি প্রাথমিক শিক্ষা বেসরকারি তথা এনজিওকরণের দিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ২টি বিশেষ সুপারিশ করেছে।

একটি হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারি শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে প্রাথমিক শিক্ষার সুনাম বিনষ্ট করে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যতে নতুন সরকারি শিক্ষক নিয়োগ না করে খণ্ডকালীন শিক্ষকের মাধ্যমে যাত্রা করার ষড়যন্ত্র।

কনসালটেশন কমিটির মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করে তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। অথচ কনসালটেশন কমিটি ৮ম শ্রেণি উন্নীত ৭২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করার সুপারিশের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় গরিব মানুষের সন্তানদের অবৈতনিক শিক্ষার পথ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

যদিও অভিভাবক মহল এ ঘৃণিত কর্মের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট রিট দায়ের করে বিষয়টিকে সাময়িকভাবে রুখে দেন।

সচিব, মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। আশাকরি আদালত অবৈতনিক শিক্ষা সমৃদ্ধ করার পক্ষে রায় দেবেন।

যেখানে অবৈতনিক শিক্ষা সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মেয়েদের ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার কথা ঘোষণা করেছে, সেখানে এনজিও নিয়ন্ত্রিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আশা করি অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা সমৃদ্ধ করার কাজ করবে।

শিক্ষকদের কষ্ট লাগবে অতিরিক্ত শিক্ষক দেওয়াসহ জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত করে শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীত করা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান শিক্ষক পদে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় কার্যকর করা বিষয়েও গিট্টু লাগিয়ে তাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছেন। প্রধান শিক্ষকদের ২য় শ্রেণির মর্যাদার আদেশ জারি হয়েছে ২০১৪ এর ৯ মার্চ।

মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের গর্ভে ওই সময় থেকেই ১০ম গ্রেড প্রদানের কথা উল্লেখ করা আছে।

আপিল বিভাগ শুধু টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ছাড়া হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের আদেশ প্রদান করেছেন। শুধু রায়ে বাস্তবায়নের তারিখ উল্লেখ করেননি। এ প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আইনি মতামত চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। আইন মন্ত্রণালয় যথারীতি ২য় শ্রেণি প্রাপ্তির সময় থেকে ১০ম গ্রেড প্রদানের জন্য আইনি মতামত দেন। অথচ সবকিছু উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রিটকারীদের ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এবং বাকি সকল প্রধান শিক্ষক পদে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে ১০ম গ্রেড প্রদানের জিও জারি করে।

শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়নের প্রত্যয়ে ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহার।

দেশের উন্নয়ন তরান্বিত করার জন্য শিক্ষার উন্নয়নের বিকল্প অন্য কিছু নেই। সে লক্ষে প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ইশতেহার।

শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ তার মধ্যে অন্যতম ভাবনা। তৃণমূলের জনগণের সন্তানদের শিক্ষিত করতে না পারলে সার্বিক উন্নয়ন অনেকটা ষোল আনাই মিছে। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। বিগত সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বক্তব্যে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। বিশেষ করে সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে তার জোরালো সমর্থন ছিল।

যদিও শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের সাথে জড়িত শিক্ষকদের নিরাপত্তাসহ জীবনধারণের উপযোগী আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপত্তা ব্যতিরেকে শিক্ষক সমাজ মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে চলতে পারবে না। এজন্য সর্বাগ্রে দরকার বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করণ। জাতীয়করণ ব্যতিরেকে শিক্ষকেরা দলীয় রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন না।

শিশু শিক্ষায় এনজিওদের প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। সকল শিশুর জন্য অভিন্ন সময়সূচি, পাঠ্যবই, মূল্যায়ন ব্যবস্থা কাম্য। সবার আগে বৈষম্যহীন শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা কাম্য।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা নির্বাচিত সরকারের কাছে আশু কাম্য—পর্যায়ক্রমে হোক বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য কমিয়ে এনে দ্রুত জাতীয়করণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া। সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর সময়ক্ষেপণ না করে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা। প্রাথমিকের সহকারীদের ১১তম গ্রেড দিয়ে দ্রুত সময়ে ১০ম গ্রেড প্রদান।

বৈষম্যহীন ২য় শ্রেণির মর্যাদা পাওয়ার তারিখ থেকে প্রধান শিক্ষক পদে ১০ম গ্রেড প্রদান।

শিশু শিক্ষায় সর্বস্তরে দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনা। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে গরিব মানুষের সন্তানদের পথ সুগম করা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে শিক্ষার উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করায় শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। শিক্ষা তথা শিক্ষার উন্নয়ন তরান্বিত হোক—এই প্রত্যাশায়।

পড়ুন:বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্যের সময় স্পষ্ট করলেন রণধীর জয়সওয়াল

দেখুন:একাধিক কেলেঙ্কারির পর ডিভোর্সের ঘোষণা দিলেন ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী | 

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন