দেশের উত্তরের জনপদ শেরপুর। ভারতের সীমান্তঘেষা গারো পাহাড়ের এই জনপদ নানা সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সুন্দর্যের লীলাভূমি। শান্তিপূর্ণ জনপদ হিসেবেও রয়েছে সুখ্যাতি। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে এই জনপদে চালু হয়েছে এক অপসংস্কৃতি। কোথাও হত্যা হলেই শুরু হয় অভিযুক্ত সহ তাদের এলাকায় লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ। খেতের আবাদি ফসল, গাছ, গবাদি পশু, ঘরের জানালা, দরজা, নগদ টাকা, গো খাদ্য কোন কিছুর রেহায় নেই। বছরের পর বছর এসব ঘটনা ঘটায় প্রতি বছর মাথা গোজার ঠাঁই সহ সর্বস্ব হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। স্থানীয় সচেতন মহল বলেছেন, এসব ঘটনায় লোটপাটের মামলা দিয়েই পুলিশ দায় সেরেছে কিন্তু হত্যা পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তের বাড়িঘর ও সম্পদ রক্ষার্থে নেয়া হয়নি কোন কার্যকর ব্যবস্থা। তবে পুলিশ বলছে, কোন অপরাধই তারা ছোট করে দেখছে না। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, হত্যার ঘটনা ঘটার পর অভিযুক্ত পরিবারের পুরুষ সদস্যরা পুলিশের গ্রেফতারের ভয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। বাড়িতে শিশু ও নারী সদস্যদের অবস্থানের সুযোগে অভিযুক্ত, অভিযুক্তের স্বজনসহ এলাকার নিরপরাধ সাধারণ মানুষের বাড়িতে লোটপাট হয়। এই লুটপাটে সুযোগসন্ধানী তৃতীয়, চতুর্থ পক্ষরাও অংশ নেয়। খুন সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে এলাকার আশেপাশের অপরাধি চক্রগুলো সক্রিয় হয়। এছাড়াও পূর্বের শত্রুতার শোধ নিতেও তৎপর হয় অন্য সবাই। তবে এসব ঘটনায় শহরের চেয়ে গ্রাম ও চরাঞ্চলের মানুষ বেশী আক্রান্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে শেরপুর জেলার সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নের হরিনধারা, শ্রীবরদী উপজেলার মালাকুচা, ভাতশালা ইউনিয়নের বিশ্ববাজার, কামারিয়া ইউনিয়নের ভীমগঞ্জ, লছমনপুর গ্রামের মুর্শিদপুর দোজা পীরের দরবার, চরশেরপুর ইউনিয়নের যোগিনীমুরা নামাপাড়া সহ অন্তত ৩০ স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর হাহাকার। বাড়িগুলোর টিন, বেড়া এবং পাকা বাড়ির ইট পর্যন্ত খুলে নেয়া হয়েছে। ফসলি জমির ফসল কেটে নেয়া হয়েছে। খাবার পানির টিউবওয়েল খুলে নেয়া হয়েছে। কিছু পরিবার এখনো গ্রামে ফিরতেই পারেনি থাকার যায়গায় অভাবে। অনেকেই এখনো আত্বীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। যাদের অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা নেই আপাতত একচালা, আবার কেউ দুচালা ঘর তৈরি করে থাকতে শুরু করেছেন। অনেক শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে পরিবারগুলো তাদের সকল সম্পদ হাড়িয়ে পথে বসে গেছে।
জেলার উল্লেখযোগ্য হত্যা পরবর্তী লোটপাট স্থান গুলো সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ শ্রীবরদী উপজেলার মালাকুচা গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে পুলিশের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শেখবর আলীকে। মামলার পরেই প্রধান আসামি জাকির হোসেন জিকো, জজ মিয়া ও সাইফুলসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু বাড়িঘর, গাছপালা ও ক্ষেতের ফসল নিয়ে গেছে।
একই বছরের ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে কথাকাটাকাটি জের ধরে মারামারিতে সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের বিশ্ববাজার এলাকায় মারা যায় রাজমিস্ত্রী উস্তাগার মো. মজনু মিয়া। সেই ঘটনায় এরশাদ আলীর ছেলে আপন, বিল্লাল হোসেন, রাজবাহাদুর, দুলাল, মাজাহার ও চাঁন মিয়ার ছেলে ফিরোজের সারের দোকানসহ বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। নিয়ে যায় ১০টি গরু ও ৫টি ছাগল। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় টানা ১০-১২ ব্যাপী অভিযুক্তদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট।
এর দুই মাস পরে ২৯জুন শনিবার সকালে উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের যোগিনীমুরা নামাপাড়া এলাকায় কৃষক ছামেদুল হক কেনা (৬৫) কে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে পিটিয়ে ও পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ উঠে প্রতিবেশী পল্লী চিকিৎসক হারুন ও সিদ্দিক খলিফার বিরুদ্ধে। সেখানে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। তাদের অন্তত ৩০টি বাড়িঘর লোটপাট হয়।
এর দুই মাস পর ২৪ আগস্ট স্থানীয় একটি মসজিদের চাঁদা নিয়ে বিরোধের জের ধরে জেলার শ্রীবরদীতে মারপিটের ঘটনায় মারা যায় দুই ভাই লিটন মিয়া (৪৩) ও শিক্ষক শরিফুল ইসলাম (৪৮)। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসীরা অভিযুক্তদের ১৬টি বাড়িতে লোটপাট সহ অগ্নিসংযোগ করে। এই লোটপাট দিন দুপুরে চলে টানা ১৫দিন। কিন্তু পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
এর পর একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে সদর উপজেলার বলাইয়েরচর ইউনিয়নের জঙ্গলদী ফতু মুন্সির মোড় এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ সাড়ে পাঁচ একর জমি নিয়ে বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে লালু খাঁ (৫৭) ও মগর খাঁ (৬৫) নামে দুজন নিহত হয়। তাদেরও ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা ও ব্যাপক লুটপাট হয়। ফলে পরিবারগুলোতে এখনো স্বচ্ছলতা ফিরেনি।
এর পর সেই বছরের ২৬ নভেম্বর শেরপুর সদর উপজেলার লছমনপুর গ্রামের মুর্শিদপুর খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার ওরফে দোজা পীরের দরবার শরীফের মুরিদ ও স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্রশিক্ষক এবং তৌহিদী জনতার মধ্যে সংঘর্ষের জেরে ২৭ নভেম্বর মারা যায় লছমনপুর কান্দা শেরীরচর গ্রামের হাফেজ উদ্দিন। পরদিন ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নিহত হাফেজ উদ্দিনের জানাজার নামাজে আসা অংশগ্রহণকারী তৌহিদী জনতা ওই দরবার শরীফে হামলা চালায়। এসময় তারা পীরের আস্তানায় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও তান্ডব চালিয়ে কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে। তবে পুলিশ মামলা নিয়েছি।
এছাড়াও বছরের শেষের দিকে ২ ডিসেম্বর সোমবার সকালে সদর উপজেলার চরশেরপুর নিজপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল হাসানের ছেলে সেনাসদস্য ওয়াসিম আকরাম (২৬) কে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হয় ৭ জন। তবুও থেমে থাকেনি লোটপাট। টানা ৭দিনব্যাপী লোটপাটে ১০/১২ বাড়ি জিনিসপত্র সহ জমির ফসল নিয়ে যায়। এছাড়াও দিন দুপুরে জমির মাটি ভেকু দিয়ে খনন করে ইটভাটায় বিক্রি করা হয়।
এছাড়াও চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে শেরপুরের সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নের হরিণধরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন অভিভাবক সদস্য মো. হারেজ আলী (৪০)। এর পর নেক্কারজনক ঘটনা ঘটায় একটি পক্ষ। টানা দেড় মাসে এই গ্রামের প্রায় শতাধিক বাড়িঘরে লুুটপাট চলে। গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাড়িগুলোর প্রত্যেকটি ঘর ভেঙ্গে আসবাবপত্র, হাড়ি পাতিল, কাথা, বালিশ, ল্যাপ তোশক, টিনের চাল, বেড়া, বিদ্যুতের তার মিটার এমনকি দেয়ালের ইট পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে। এছাড়াও, এসময় ৭০টি গরু, ১৮০টি ছাগল, কয়েকশত হাস মুরগি, ৮০টি সেচ পাম্প সহ প্রায় কয়েক কোটি টাকার মালামার লুট করে নিয়ে যায়।
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের ভীমগঞ্জ মাদরাসার সামনে দিন দুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে শেরপুর সদর থানার যুগ্ম আহ্বায়ক ও শেরপুর সরকারি কলেজের সাবেক এজিএস জাকারিয়া বাদল (৪৭)। কামারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক লুৎফর রহমান এবং আওয়ামী কৃষকলীগ নেতা কারাবন্দি নুরে আলমের সঙ্গে জাকারিয়া বাদলের দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই হত্যাকাণ্ডের পরেও চলে একই ধরনের লুটপাট। আসামি পরিবারের বাড়িতে সপ্তাহ ব্যাপী দিনে দুপুরে চলে লোটপাট ও অগ্নিসংযোগ।
ভুক্তোভোগী পরিবারগুলো জানায়, আমাদের এই ধরনের লুটপাটের ঘটনায় মামলা করেছি। এছাড়াও আমাদের বাড়িঘর লোটপাটের সময় পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাইনি। এছাড়াও আমাদের দেয়া লোটপাটের মামলায় তেমন কোন ফলাফল পাইনি। প্রতিটি অপরাধের জন্য বিচার আছে। একটা অপরাধের বিচার অন্য অপরাধ দিয়ে হয়না। আমরা চাই এই ধরনের সংস্কৃতি বন্ধ হোক।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই অপ সংস্কৃতিকে আইনের দুর্বল প্রয়োগ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এ ব্যাপারে শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের প্রভাষক মাসুদ হাসান বাদল বলেন, টানা কয়েকবছর যাবত শেরপুরে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এই ধরনের ঘটনা ঘটবে এটা এখন পরিক্ষিত সত্য। এমন ঘটনা ঘটার পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সেই পরিবারগুলোর সম্পদ রক্ষার্থে ব্যবস্থা নেয় তাহলেই মানুষ এমন কাজ করার সাহস পাবেনা।
শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট এমকে মুরাদুজ্জামান বলেন, এই ঘটনা গুলো আমাদের শেরপুরে সামাজিক ব্যাধিতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। এর জন্য সামাজিক প্রতিরোধ বলয় তৈরি করা জরুরি। তা না হলে এমন ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে যৌথ সামাজিক প্রতিরোধ বলয় তৈরির পরামর্শ দেন।
জেলার পিপি এ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, খুন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ বড় অপরাধ। যেহেতু ঘটনাটি এখন সংস্কৃতি হয়ে গেছে তাই হত্যা পরবর্তী সময়ে তাদের বাড়িঘর রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু মামলা নিয়ে আদালতে চার্জশিট দিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পূর্বের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এসবকে উৎসাহিত করছে। এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যাতে করে খুন ও খুন পরবর্তি একটি ঘটনাও না ঘটে তার জন্য সংশ্লিষ্ঠদের তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এ ব্যাপারে শেরপুর জেলা পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, হত্যা পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বা তৃতীয় পক্ষ আসামিদের বাড়িঘরে লোটপাট করে। এমন যতগুলো ঘটনা ঘটেছে আমরা লোটপাটের মামলা নিয়েছি। এবং যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দিয়েছি যেন তাদেরও বিচার হয়। আমরা কোন অপরাধকেই ছোট ভাবে দেখিনা।
পড়ুন: শেরপুরের গাড়ো পাহাড় আনারস চাষে সম্ভাবনাময় স্থান হয়ে উঠছে
দেখুন: জিপিএ-৫ পেলেও দেখে যেতে পারেননি তানাজ; স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবার |
ইম/


