দীর্ঘ ১৭ বছরের এক অদ্ভুত ও কঠিন প্রতিজ্ঞা। দলের চরম দুঃসময়ে পায়ে জুতা না পরার যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন, অবশেষে তার অবসান ঘটেছে। ১৭ বছর খালি পায়ে হাঁটার পর আবারও পায়ে জুতা গলিয়েছেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ইয়ারপুর গ্রামের বাসিন্দা সুরুজ পাঠান। তিনি ওই ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি।
সুরুজ পাঠানের জুতা পায়ে দেওয়ার ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। পেশায় গ্রাম্য ধান-চাল ব্যবসায়ী এবং মৃত কাদির পাঠানের ছেলে সুরুজ পাঠানের এই অটল রাজনৈতিক বিশ্বাসের গল্প এখন কলমাকান্দার মানুষের মুখে মুখে।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিন ঘটেছিল সেই ঘটনা। সুরুজ পাঠানের ভাষ্যমতে, সেদিন ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়া শেষে আসরের নামাজের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় কিছু মানুষের সাথে তার তর্কাতর্কি ও হট্টগোল হয়। সেসময় ভিড়ের মাঝে তার পায়ের একটি জুতা কাদায় আটকে খুলে যায়। অনেক চেষ্টা করেও সেটি আর তুলতে পারেননি তিনি। ক্ষোভে ও অভিমানে অপর জুতাটিও তিনি সেখানেই ফেলে আসেন। সেদিনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, যতদিন তার দল (বিএনপি) ক্ষমতায় না আসবে, ততদিন তিনি আর জুতা পায়ে দেবেন না।
দীর্ঘ ১৭ বছর রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খালি পায়েই ব্যবসা ও দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন সুরুজ পাঠান। সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দল ক্ষমতায় আসার পর তার সেই দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। গতকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদুর রহমান ভূইয়া ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি মিলে তাকে নতুন জুতা পরিয়ে দেন। দীর্ঘদিনের কষ্ট সার্থক হওয়ায় তিনি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
প্রতিজ্ঞা পূরণ হলেও একান্ত আলাপচারিতায় সুরজ পাঠান তার মনের একটি সুপ্ত বাসনার কথা জানিয়েছেন। তার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, যেদিন দল ক্ষমতায় আসবে এবং তারেক রহমান দেশের দায়িত্ব নেবেন, সেদিন তারেক রহমানের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো একজোড়া স্যান্ডেল বা জুতা তিনি পায়ে দেবেন। সেই স্বপ্নটি পুরোপুরি পূরণ না হওয়ার একটি ছোট্ট আক্ষেপ তার মনে রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূইয়া বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমি তাঁকে বারবার অনুরোধ করার পরও সুরুজ পাঠান জুতা পরেননি। এমন তীব্র শীত, যখন আমরা জুতা-মোজা পরেও থাকতে পারি না, সেই শীতেও তিনি খালি পায়ে হেঁটেছেন। তাঁকে এ অবস্থায় দেখে আমাদের খুব কষ্ট হতো। তখন তাঁকে জুতা পরতে বললেও তিনি তা পরেননি। দলের জন্য তাঁর এই প্রতিজ্ঞা ও ত্যাগ সত্যিই অসাধারণ। বিএনপির জন্য এমন হাজার হাজার নেতাকর্মী রয়েছেন, যারা দলকে ভালোবেসে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। সুরজ পাঠান তাঁদেরই একজন। তাঁর কাছ থেকে আমরা অনেক অনুপ্রেরণা পাই। এমন ত্যাগী নেতাকর্মীদের যদি আমরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করি, তবে দল আরও সুসংগঠিত হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
সাইদুর রহমান ভূইয়া প্রত্যাশা করে আরও বলেন, সুরুজ পাঠানের মতো নেতাকর্মীদের যেন আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারি। তাঁর একটি বিশেষ দাবিও রয়েছে। আমি যখন তাঁকে জুতা পরিয়ে দিই, তখন তিনি জানান যে, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মহোদয়ের মাধ্যমে, আজকের যিনি প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, তাঁর সামনে জুতা পরতে পারলে তিনি মনে শান্তি পেতেন। তাঁর এই আকুতি ও মনের ইচ্ছেটুকুও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন।
পড়ুন- শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো বদলি বাণিজ্য চলবে না: শিক্ষামন্ত্রী


