আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। এই নির্বাচনকে ঘিরে নতুন ভোটাররা হতে পারেন ‘ট্রাম্পকার্ড’। পাশাপাশি নারী ভোটার ও নৌকা সমর্থকদের অংশগ্রহণ এবার সব পাল্টে দিতে পারে ভোটের সমীকরণ।
এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। তিনি বলেন, “আমরা একটা সুরক্ষিত বাংলাদেশ চাই। নারী পুরুষ জনগণ সবার জন্য ভাল চাই। জামায়াত আসুক, এনসিপি আসুক, স্বতন্ত্র কেউ হোক বা বিএনপি আসুক যেটাই হোক—আমাদের সবগুলো অধিকার যেন পূরণ হয়।”
নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কী হবে, এ প্রশ্নে ফারজানা বলেন, “নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য এবং দেশের সংস্কার। এছাড়া আমাদের যে বাক স্বাধীনতা, ওইটা যেন এখনের মতো ঠিক থাকে—এটাই আমরা চাই। আর আমাদের যাতে মেয়ে হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।”
ফারজানার মতো ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটের এক-তৃতীয়াংশ। বিগত তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম এবং একতরফা ভোটের কারণে এবার তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ দায়িত্বশীলভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ফারজানার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আড্ডায় ছিলেন ফারহানা খানম। তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কী, এ প্রশ্নে তিনি স্বল্প কথায় বলেন, “যাতে নারীদেরকে সুন্দর চোখে দেখে, সেইফ থাকে, দুর্নীতি কম হয়, রেইপ কম হয়।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের একজন ছাত্র বলেন, “বেকার যারা আছে, তাদের চাকরির সুযোগ, যারা ব্যবসা করতে চায়, তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং ঋণ দেওয়া। তরুণরা সম্পূর্ণ দুর্নীতি মুক্ত এবং ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই।”
ভোটের আগে বাংলাদেশে এগুলোই মোটামুটি সার্বজনীন ইস্যু। শিক্ষার্থীদের কথায় দেশের আপামর মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তরুণরাই ১৯৭১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই ভোটারদের মনোভাব নির্বাচন ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়, কারণ বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোটের প্রকৃত চিত্র সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “তারা বিপুল সংখ্যায়, তারা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে এবং তাদের মনে কী আছে আমরা জানি না। বিএনপির মধ্যে অনেক তরুণ আছে, জামায়াতের মধ্যেও অনেক তরুণ আছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলিতে আমরা একধরনের প্রবণতা দেখেছি। মাদ্রাসাগুলিতেও এক ধরনের প্রবণতা আছে। কাজে তরুণ ভোটাররা তাদের টার্ন আউটটা বেশি হবে।”
বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে অর্ধেক নারী। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নারীরাও নির্বাচনের সমীকরণ পাল্টাতে সক্ষম। তিনি বলেন, “তাদের বিপুল উপস্থিতি যদি থাকে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায় তাহলে এটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। এখন নারীদের উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। গোলমালের আশঙ্কা থাকলে অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। কেউ হ্যারাসড হতে চাইবে না।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান মনে করেন, ভোটের দিন পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। “অলরেডি যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে, সকালের দিকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ার চেষ্টা করলে মুখোমুখি সংঘর্ষের সম্ভাবনা আছে। যদি এমন সংঘর্ষ হয়, নারীরা ভয় পেয়ে ভোট দিতে আসবেন না।”
তিনি বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের।
এবার নৌকার সমর্থক ভোটারদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “আওয়ামী লীগকে আগে যারা ভোট দিত, তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। তবে সমর্থকরা ভোট দেবেন, এবং তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত নিজস্ব বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে। তারা দেখবে, কম ক্ষতিকর কে—বিএনপি না জামায়াতে ইসলামী—তার ওপর ভোট দেবেন।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান উল্লেখ করেন, নৌকার সমর্থক ভোটারদের ভোট বিশেষ কিছু আসনে জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রবাসী ভোট ক্ষেত্রেও নৌকার সমর্থকের ভূমিকা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
পড়ুন: দেশে চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ করা হবে: জামায়াত আমির
আর/


