হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে সুনামগঞ্জে কৃষক জনতার এক গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলের শতাধিক কৃষক। শনিবার (১১ এপ্রিল) সকাল ১১টায় জেলা শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট সংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন, সুনামগঞ্জ’-এর উদ্যোগে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনের সঞ্চালনায় এবং সভাপতি রাজু আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহ-সভাপতি ওবায়দুল মুন্সী।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৃষকরা বলেন, প্রতি বছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয় না। নিম্নমানের কাজ, সময়মতো নির্মাণ না হওয়া এবং তদারকির অভাবে সামান্য পানির চাপেই বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে এক রাতেই পানিতে তলিয়ে যায় কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন—বোরো ধান।কৃষানী সুলতানা বেগম বলেন, “আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে ফসল ফলাই, কিন্তু বাঁধ ঠিকমতো না থাকায় সব পানিতে ভেসে যায়। আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না।”অন্যদিকে কৃষক মতিউর রহমান অভিযোগ করেন, “দুর্নীতির কারণে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষতিপূরণও সঠিকভাবে দেওয়া হয় না। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন মির্জা ফারুক, শাহাব উদ্দিন, আব্দুল হান্নান, রমজান আলী, মোশাহিদ আলী, নুরুল আমিন, আব্দুল কাদির, জাবেদুল্লাহসহ স্থানীয় কৃষকরা।
বক্তারা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও দুর্নীতির কারণেই প্রতিবছর হাওরের ফসল ঝুঁকির মুখে পড়ে। তারা বলেন, পরিকল্পনাহীনভাবে বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং সঠিক তদারকির অভাবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।সমাবেশে সংগঠনের উপদেষ্টা প্রফেসর মহিবুল ইসলাম, চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, সাবেক জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম কর্মী জাহাঙ্গীর আলম, সমাজসেবক নুরুল হকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া ছাতক, মধ্যনগর, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার নেতৃবৃন্দও সমাবেশে অংশ নিয়ে স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরেন এবং সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সমাবেশ থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় ১০ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়— ১. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রকাশ করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ২. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি ঋণ ও এনজিও ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হবে। ৩. সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পিত স্লুইসগেট স্থাপন করতে হবে। ৪. অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বরাদ্দকৃত পিআইসি পুনঃতদন্ত করে সঠিক মেজারমেন্ট অনুযায়ী বিল প্রদান করতে হবে।
৫. ফসল রক্ষা বাঁধের নামে ফসলি জমি কর্তন, হাওরের কান্দা কাটা ও মাটি লুট বন্ধ করতে হবে।
৬. পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে।
৭. ফসল রক্ষা বাঁধ কার্যক্রমের সার্ভে ও প্রাক্কলন যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমকে অবহিত করতে হবে; কাবিটা নীতিমালা ২০২৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী স্বচ্ছ পিআইসি গঠন নিশ্চিত করতে গণশুনানি আয়োজন করতে হবে। ৮. হাওরের উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ৯. হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত নদী, খাল ও বিল দ্রুত পরিকল্পিতভাবে খনন করতে হবে। ১০. যাদুকাটা, ধোপাযান, চিলাই, খাসিয়ামারা নদীসহ অন্যান্য নদীতে অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। সমাবেশ শেষে কৃষকরা হাওরের ফসল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দাবি আদায় না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

