নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার তুলশীরাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) নিয়োগে বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে। নথিভিত্তিক অনুসন্ধানে রেজুলেশন খাতা ও সময়রেখা বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই একজন শিক্ষককে নিয়োগপত্র প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে সেই নিয়োগকে বৈধতা দেওয়ার লক্ষ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, বিদ্যালয়টি বেসরকারি থাকা অবস্থায় ৩০ জানুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে মোঃ জাহাঙ্গীর কবিরকে সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) পদে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। অথচ ওই নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে দৈনিক নীলকথা পত্রিকায়। শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী যেখানে প্রথমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরে নিয়োগ বোর্ড গঠন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ায় বিষয়টি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নথিভিত্তিক অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আলোচিত নিয়োগকে বৈধ দেখানোর জন্য খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হলেও সময়রেখায় রয়েছে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য। নথি অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর ২০১২ ইং তারিখে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় এবং ৫ জানুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে এ বিষয়ে একটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। অথচ খণ্ডকালীন নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই, ৩০ জানুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে স্থায়ীভাবে নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। পরদিন, অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
পরবর্তীতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিকতা দেওয়ার লক্ষ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং তারিখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক যোগদানের আবেদন করেন।
এই সময়রেখা বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, সিদ্ধান্ত ও বিজ্ঞপ্তির আগেই নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়েছে, যা নিয়োগ বিধিমালার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজি) প্রতিনিধির উপস্থিতির কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, ডিজি প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়া কোনো নিয়োগ আইনসিদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্টরা এটিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আরেকটি বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন,“নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই যদি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়, তাহলে সেটি সরাসরি বিধি লঙ্ঘন। নথিতে যে সময়রেখা দেখা যাচ্ছে, তাতে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ।”
অন্য একজন অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন,“খণ্ডকালীন সিদ্ধান্তের আগেই স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে বিধি পাশ কাটানোর ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের নিয়োগ প্রশাসনিক তদন্ত ছাড়া বৈধ হতে পারে না।”
আরেকজন সাবেক প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“ডিজি প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়া নিয়োগ হলে সেটি শুরু থেকেই অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে সরকারি হলেও এমন নিয়োগ নিয়মিত করার সুযোগ নেই।”
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবিরের মুঠোফনে যোগাযোগ করা হলে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় বলেই কল কেটে দেন তিনি। পরবর্তীতে একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলোও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিল্পী আক্তার বলেন, “আমি এই বিদ্যালয়ে নতুন যোগদান করেছি। আমার যোগদানের আগের বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই। বিষয়টি প্রথমবার অবগত হলাম। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন,“এই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমেই আমি প্রথমবার জানতে পারলাম। যদি কোন অভিযোগ পেয়ে থাকি, তাহলে অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, তুলশীরাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৩০ আগস্ট ২০১৭ ইং তারিখে সরকারি হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, সরকারি হওয়ার সময় কেবল এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাই এডহক ভিত্তিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আলোচিত শিক্ষক বেসরকারি অবস্থায় এমপিওভুক্ত না হয়েও বর্তমানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।
পড়ুন- গাজীপুরের পূবাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে মা ও ২ সন্তানের মৃত্যু
দেখুন- যবিপ্রবি’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের উচ্ছ্বাস


