দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সরকারি হাইস্কুল ভবনের জায়গা ও ছাত্রাবাসের দুতলা ভবন দখলের রাখা অভিযোগ উঠেছে বান্দারবানের আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও বেতছড়া মৌজার হেডম্যান হ্লাথোয়াই হ্রী মারমা নেতার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয় ছাত্রাবাস ভবনটিকে ভাড়া দেয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয় নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নিজের স্বপরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছে বলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা পরিষদ থেকে যে ছাত্রাবাস দেয়া হয়েছে সেটি আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন ক্ষমতা দাপটে দীর্ঘ বছর ধরে দখলেই রেখেছেন তারাছা হেডম্যান। দুতলা ভবনকে নিজ অফিস ও দলীয় কার্যালয়ে বানিয়ে স্বপরিবার সহ বসবাস করতেন। এসব দেখে এলাকাবাসীরা কেউ মুখ খুলে সাহস করে বলতে পারেননি।
অনুসন্ধান জানা গেছে, ১৯৯২ সালে কাঁচা একটি ঘরে যাত্রা শুরু হয় রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের বেতছড়া হাইস্কুলের। ১৯৯১ সালে ইউনিয়নটির বেতছড়া বাজার ঘেঁষা খাস ভূমিতে স্কুলটির জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়। ২০০৬- ২০০৭ অর্থ বছরে উন্নত পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ অর্থায়নে একতলা ভবন ও ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে ছাত্রাবাসে দুতলা ভবন নির্মাণ করে দেয়া হয়। কিন্তু সেই দুটি ভবনই নিজ দখলে রেখেছে এই আওয়ামী লীগ নেতা।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, তারাছা ইউনিয়ন পরিষদ তিনবার চেয়ারম্যান ও একবার রোয়াংছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার অংসাপ্রু মারমা মৃত্যু পর বেতছড়া মৌজার হেডম্যান পদে দায়িত্ব পান হ্লাথোয়াই হ্রী।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বান্দরবানে মগ বাজারে ফান্ডে বাজার চৌধুরী। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অভিজিত চাকমার কাছ থেকে কেনা জমির কাগজে দীর্ঘ বছর ধরে জায়গা ও সরকারি ভবন দখল করে রেখেছে। কিন্তু ৫ আগষ্টের পর তারাছা আওয়ামী লীগ কার্যালয় সম্বলিত সাইনবোর্ডটি তিনি সরিয়ে দেন।
পার্বত্য জেলা পরিষদ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে বেতছড়া হাইস্কুলসহ জেলার ১৮টি বেসরকারি হাইস্কুল অনুমোদন দেয় তৎকালীন স্থানীয় সরকার পরিষদের (বর্তমান নাম বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ) চেয়ারম্যান সাচিংপ্রু জেরী। ১৯৯১ সালে খাসজমিতে স্কুলটির জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেন তৎকালীন তারাছা হেডম্যান অংসাপ্রু মারমা ( বর্তমান হেডম্যান হ্লাথোয়াই হ্রী বাবা)। ১৯৯২ সালে দুর্গম বেতছড়া হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা পর শিক্ষাক্রম পাঠদান যাত্রা শুরু হয়। সে সময় বেতছড়া হাইস্কুলটি উদ্বোধনও করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান সাচিংপ্রু জেরী। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে ভবন বেদখল থাকায় বন্ধ হয়ে যায় হাইস্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম।
বেতছড়া হাইস্কুলের কমিটি জানিয়েছে, ২০০২ সালে তৎকালীন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অনুযায়ী হাই স্কুলকে এমপিওভুক্ত করার জন্য স্কুলের নামে ব্যাংকের সাধারণ হিসাবে ৬০ হাজার টাকা ও সংরক্ষিত হিসাবে ৬৫ হাজার টাকা জমা দিয়েছিল। সেসময় স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন হেডম্যান হ্লাথোয়াইহ্রী। সেই বছরে তৎকালীন এমপি বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের বাস ভবনে স্কুলের শিক্ষকরা গিয়ে স্কুলকে এমপিভুক্ত করার আবেদন করেন। এসময় হ্লাথোয়াইহ্রীকে ডেকে স্কুলকে এমপিভুক্ত করার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন বীর বাহাদুর৷ কিন্তু কোন উদ্যোগ নেয়নি হ্লাথোয়াইহ্রী। এতে নিরাশ হয়ে চাকুরি ছেড়ে দেন শিক্ষকেরা।
তারাছা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা জানান, এলাকাবাসীর দাবি পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের শেষের দিকে বেতছড়া হাই স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও পাঠদানের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে তিনটি কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন তারাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উনুমং মারমা। এর ফলে এলাকার অন্তত ১৮-২০ পাড়ার ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া উনুমং এর উদ্যোগে দীর্ঘদিন হ্লাথোয়াইহ্রীর দখলে থাকা দুটি সরকারি ভবনকে দুরের পাড়ার শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল করা হয়েছে। গত এক বছর ধরে হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে।
তারাছা বেতছড়া হাইস্কুল তথ্য মতে, গত কয়েক মাসে স্কুলে ও হোস্টেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী মিলে মোট ৭৩ জন ছেলেমেয়ে অধ্যয়ন রয়েছে। গত বছর নিয়োগ পাওয়াসহ মিলে স্কুলে পাঁচ জন শিক্ষক কর্মরত আাছেন। এছাড়া অন্যান্য পদেও জনবল রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তকরণসহ অষ্টম শ্রেণী থেকে উন্নীত করে পরিপুর্ণ একটি উচ্চ বিদ্যালযে পরিণত করা পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠা কতৃপক্ষদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেতছড়া হাইস্কুলে শিক্ষা পাঠদান করছে তারাছা ইউপি পরিষদ। কিন্তু পরিষদের সামনে কিছুটা ভবন তুললেও খালি অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে জায়গায় নিয়ে দুপক্ষ দ্বন্দে আটকে আছে স্কুলের কার্যক্রমে কাজ। অপরদিকে ছাত্রাবাসে দুতলা ভবনে আছে তারাছা হেডম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক হ্লাথোয়াহ্রীর কাছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কারণে অন্যস্থানে চলছে ছাত্রাবাসের নির্মানে কাজ।
স্কুলের জায়গায় মালিক মংবাথোয়াই মারমা বলেন, আমার বাবা লেখাপড়া জানতেন না। তৎকালীন হেডম্যান ও বর্তমান হেডম্যান হ্লাথোয়াইহ্রীর বাবা মৃত অংসাপ্রু মারমা চালাকি আমাদের জমি ভোগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে হ্লাথোয়াইহ্রী যে জমিটি স্কুলকে দান করেছে সে জমির কাগজে থাকা চৌহদ্দীর সঙ্গে জমির বাস্তবতার মিল নাই। গত মাসের ৫ তারিখ ইউএনওর উপস্থিতিতে মিলিয়ে দেখা হয়েছেে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের তদন্তেও এসব বিষয় উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক বেতছড়া হাইস্কুলে সদস্য ও তারাছা এক ইউপি সদস্য বলেন, হাইস্কুলের জায়গায় নিয়ে এখন দ্বন্দ সৃষ্টি হয়েছে। জায়গার মালিক ছিল হ্লাথোয়াইহ্রী এখন অপর একজন দাবী করছে। স্কুলের মাঠে এখনো পিলার রয়েছে। তাছাড়া মামলা চলমান রয়েছে। অন্যদিকে স্কুলের ছাত্রাবাসে তিনি স্বপরিবারসহ দুতলা ভবন ব্যবহার করে আসছে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও বেতছড়া মৌজার হেডম্যান হ্লাথোয়াইহ্রী মারমা সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তারাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উনুমং মারমা বলেন, ১৯৯৬-৯৭ সালে বেতছড়া হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেছি। গত বছর থেকে বেতছড়া হাই স্কুলের পুরানো দুটি ভবন শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল করা হয়েছে। দ্বিতল ভবনের উপরের তলায় মৌজার হেডম্যান হ্লাথোয়াইহ্রী থাকেন। ১৫ টি পাড়ার সম্মিলিত সহযোগিতায় হোস্টেলটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি মাসে যে যার সামর্থ অনুযায়ী চাল, নিত্যপণ্য, নগদটাকা প্রভৃতি সহযোগিতা করছেন। এছাড়া সরকারি শিক্ষক শিক্ষিকারাও সহযোগিতা করছে।
রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, কোন ব্যক্তি যদি স্কুলের জন্য কিছু দিয়ে থাকেন সেটা অন্যভাবে ব্যবহার করা অন্যায়। স্কুল সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত চলছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে সাবলীলভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাসহ পাঠদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তবে সরকারি ভবন দখল সংক্রান্ত কেউ কোনো অভিযোগ দিলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
এনএ/


