অপরিশোধিত তেলের বাজারে আবার সংকট শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম লাফিয়ে ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সত্তরের দশকের সেই ভয়াবহ ‘জ্বালানি তেলসংকটের’ দুঃসহ স্মৃতিকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ১২.৭৭ ডলার বা ১৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫.৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচারসের দাম ১২.৬৬ ডলার বা ১৪ শতাংশ বেড়ে ১০৩.৫৬ ডলারে পৌঁছেছে।
অত্যন্ত অস্থির এই সেশনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ১১৯.৫০ ডলারে উঠেছিল; যা একদিনে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম বৃদ্ধি। ডব্লিউটিআইয়েএর দামও এক পর্যায়ে ১১৯.৪৮ ডলারে পৌঁছায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এলএসইজির ১৯৮০ সাল পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তেলের দাম সর্বোচ্চ ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ ডলারে উঠেছিল।
এলএসইজির ২০০৪ সাল পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের বর্তমান ও ছয় মাস পরের সরবরাহ চুক্তির মূল্যের ব্যবধান রেকর্ড ৩৬ ডলারে পৌঁছেছে। এই ব্যবধান ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকের ২৩ ডলারের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষণে একে ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ বলা হয়; যা বর্তমান বাজারে তীব্র সরবরাহ সঙ্কটের লক্ষণ।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগ তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের এক সপ্তাহের মাথায় তেহরানের ক্ষমতায় শক্ত অবস্থানে রয়েছে দেশটির সরকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও লজিস্টিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আরও কয়েক মাস চড়া জ্বালানি মূল্যের মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ গ্যালনপ্রতি ৩.২২ ডলারে উঠেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয়ে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, সৌদি আরবের বৃহত্তম জ্বালানি উৎপাদানকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর দুটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওপেক-ভুক্ত দেশগুলোও মজুদ ফুরিয়ে আসায় উৎপাদন কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনও শনিবার থেকে উৎপাদন কমিয়ে ফোর্স ম্যাজেউর (অনিবার্য পরিস্থিতিতে চুক্তি পালনে অক্ষম) ঘোষণা করেছে।
গ্যাসের বৈশ্বিক বাজারের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শিল্পাঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাহরাইনের বিএপিসিওর পরিশোধনাগারে ইরানের হামলার পর ফোর্স ম্যাজেউর ঘোষণা করা হয়েছে। সৌদি আরব ইতোমধ্যে তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স।


