চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মেঘনা–ধনাগোদা নদীর ওপর নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ঝুলন্ত (কেবল–স্টেইড) সেতু। এই সেতু নির্মিত হলে চাঁদপুর–ঢাকা–চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব ভিখারুদৌল্লা।
সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। মতলব উত্তর–গজারিয়া সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৪,৭৮৩ কোটি টাকা। সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৮৫ কিলোমিটার এবং দুই প্রান্তে ৭.৫১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে যার মধ্যে গজারিয়া অংশে ৫.৪৬ কিলোমিটার এবং মতলব উত্তরে ২.০৫ কিলোমিটার।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঘ–১ অংশের সঙ্গে যুক্ত হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ইন্টারচেঞ্জ। পাশাপাশি নদী শাসন করা হবে ২.২ কিলোমিটার, নির্মিত হবে একটি টোল প্লাজা ও দুটি ওজন স্টেশন। সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে ২৫ মিটার, যাতে ভবিষ্যতের নৌযান চলাচলে কোনো বাধা না সৃষ্টি হয়।
বিশ্বমানের প্রকৌশল অনুসরণ করে এ সেতুর নকশায় নদীর মূল প্রবাহে একটিও পিলার না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে নদীর নাব্যতা, প্রবাহমানতা ও পরিবেশ রক্ষা পাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের অর্থায়ন করছে দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক ইডিসিএফ (ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড) এর মাধ্যমে। ঋণের সুদের হার মাত্র ০.০১%, পরিশোধকাল ৪০ বছর, গ্রেস পিরিয়ড ১৫ বছর, যা বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি চুক্তি। ইতোমধ্যে সেতুর বিস্তারিত নকশা (ডিটেইলড ডিজাইন) চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও দ্রুতগতিতে চলছে। মতলব উত্তর অংশের বিদ্যমান সড়কের সম্প্রসারণে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সেতুটি নির্মিত হলে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ভোলা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য রাজধানীতে যাতায়াত হবে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। তৈরি হবে বিকল্প মহাসড়ক রুট। শিল্পাঞ্চল, পর্যটন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে পুরো অঞ্চলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেতু নির্মাণের খবরে এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। জমিজমার দামও দ্রুত বাড়ছে।
চাঁদপুরের মতলব উত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক বলেন, এই সেতু আমাদের বহুদিনের দাবি। এটি হলে সহজে ঢাকা যাওয়া–আসা করা যাবে। রাজধানীতে বসবাসের চাপও কমবে।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এই সেতু এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে। এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সড়ক ও সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব ভিখারুদৌল্লা বলেন, আমরা আশা করছি আগামী বছরই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারব। এটি ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে।
২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য বৈষম্যহীন ও ব্যয়–সাশ্রয়ী কানেক্টিভিটি গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বমানের প্রকৌশল ও পরিবেশবান্ধব নকশা অনুসরণ করে এ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
পড়ুন: ভিজিডি কার্ডের অর্ধেক চাল না দেয়ায় চাচাতো ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ
দেখুন: স্বামীর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে স্ত্রীর আত্মসমর্পণ |
ইম/


