পরস্পর হামলা-পাল্টা হামলায় সপ্তম দিনে পৌঁছেছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত। পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক এলাকায় চালানো একের পর এক হামলায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম, আর বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
বিগত ছয় দিনে একাধিকবার ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকালে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ইরানের আরাক হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগেই আরাক ও খন্দাব এলাকার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী পানির এই চুল্লিতে উৎপাদিত উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য উপযোগী। যদিও ইরান বলছে, তাদের প্রকল্প সম্পূর্ণ বেসামরিক।
২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী, প্লুটোনিয়াম উৎপাদন কমাতে আরাকের রিঅ্যাক্টর নতুনভাবে ডিজাইন করা হয়। এমনকি যুক্তরাজ্যের সহায়তায় চুল্লিটি রূপান্তরেও কাজ করছিল তেহরান। তবু সাম্প্রতিক হামলায় এই প্রকল্পও ধ্বংসের মুখে।
ইরানের নাতাঞ্জ, ফরদো ও আরাক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের মূল কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে শক্তিশালী বাংকার। সম্প্রতি আইএইএ জানিয়েছে, নাতাঞ্জে সেন্ট্রিফিউজগুলোর কিছু অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, “সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে, যা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করছে।” ইসরায়েলি হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত ৬ শতাধিক নিহত এবং ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রি’ নামে তারা চালাচ্ছে পাল্টা অভিযান। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে পড়েছে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র। জেরুজালেম, তেল আবিব, রামাত গান, বিরসেভা সবখানেই হয়েছে ক্ষয়ক্ষতি। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১৩৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে রামাত গানের একটি আবাসিক এলাকায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বিরসেভার সোরোকা হাসপাতালে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ছাদ ধসে পড়েছে। ভেঙে গেছে দেয়ালের কাঁচ। আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রী একে যুদ্ধাপরাধ আখ্যা দিয়ে বলেন, “হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ইরান সীমা অতিক্রম করেছে।” ইসরায়েলের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যম এক্স বা সাবেক টুইটারে লেখেন, “এটা ইচ্ছাকৃত, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।”
ইরান বলছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল আইডিএফ-এর গোয়েন্দা সদর দপ্তর, যা বিরসেভার গাভ-ইয়াম টেক পার্কের পাশে অবস্থিত। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা IRNA বলছে, “এই আঘাত ছিল নির্ভুল ও পরিকল্পিত।”
এছাড়া, ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের হার্মিস ৯০০ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এটি ইস্পাহানের কাছে গুলি করে ধ্বংস করা হয় এবং সেই ফুটেজ সম্প্রচার করেছে ইরানি টেলিভিশন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আগামী শুক্রবার জরুরি বৈঠকে বসবে। ইরান, রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও আলজেরিয়ার অনুরোধে ডাকা হয়েছে এই বৈঠক। বৈঠকে অংশ নেবে ইসরায়েলও।
একই সময়ে ফ্রান্স ও ইউরোপীয় মিত্ররা এক রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর আশা, এই সংকট আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। ফরাসি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কহীন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধে আহ্বান জানিয়েছেন মাখোঁ। তিনি জানিয়েছেন, ফরাসি নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে তেহরান, কারাজসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে। ইরান বলছে, তারা কয়েকটি ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিবিসির খবর অনুযায়ী, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে গোটা অঞ্চল এখন অস্থিরতায় ভুগছে। যুদ্ধ এভাবে চলতে থাকলে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে সিরিয়া, লেবানন এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলেও।
এনএ/


