১০/০২/২০২৬, ২২:৫০ অপরাহ্ণ
21 C
Dhaka
১০/০২/২০২৬, ২২:৫০ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

১১ বছরের শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের বিবরণ আদালতে শোনালেন বিচারক

নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী। তাকে নির্যাতনের ঘটনায় সাফিকুর ও তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী আছেন। আজ মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি চলাকালে শিশুটিকে নির্যাতনের বিবরণ আদালতে তুলে ধরেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক রোবেল মিয়া গত রোববার মামলার প্রত্যেক আসামির সাত দিন রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। ওই দিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানির জন্য আজ দিন ধার্য করেন।

রিমান্ড শুনানির জন্য আজ বেলা পৌনে তিনটায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে সাফিকুর ও তাঁর স্ত্রীকে আদালতের এজলাসে ওঠানো হয়। বেলা সোয়া তিনটার দিকে বিচারক এজলাসে আসেন। রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। প্রথমে তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানিতে তিনি বলেন, মামলাটি অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। তাঁরা কেন ভিকটিমকে এ ধরনের নির্যাতন করেছেন, তার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে মামলাটির তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে আসামিদের রিমান্ড চেয়ে বক্তব্য দেন আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার। শুনানিতে তিনি বলেন, এই মামলায় চারজনের কথা বলা হয়েছে। এই চারজনই ভিকটিমকে পাশবিক নির্যাতন করেছেন। কী কারণে তাঁরা নির্যাতন করেছেন, তা জানা দরকার।’

শিশু আইনে ১২ বছরের নিচে কাউকে কাজে রাখা যায় না উল্লেখ করে এই আইনজীবী আদালতে বলেন, বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে আইন জানা সত্ত্বেও কেন গৃহকর্মী হিসেবে শিশুকে রাখলেন? সেখানে তিনি কাজে নিয়ে এমন নির্যাতন কীভাবে করেন? এমনকি কাজের মহিলাও তাকে বিভিন্ন সময় থাপ্পড় মারতেন। ভুক্তভোগীকে মারার জন্য ওই বাসায় খুন্তি রেডি ছিল। এ ঘটনা সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। দেশ ও জাতির জন্য খুবই ন্যক্কারজনক। আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন জানান তিনি।

পরে আসামিদের উদ্দেশে বিচারক বলেন, ‘আপনারা তাকে নির্যাতন করেছিলেন কেন?’ আসামি বিথী বলেন, ‘আমার এখানে সেভাবে নির্যাতন হয়নি। এর আগে তাকে অন্য জায়গায় কাজে দেওয়া হয়েছে। পরে আমার এখানে আসে।’

বিচারক বলেন, তাহলে কীভাবে নির্যাতন হয়েছে? আসামি বিথী বলেন, ‘সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। সে জন্য তাকে চড়–থাপ্পড় মেরেছি।’

বিচারক বলেন, তাঁকে নির্যাতনের ছবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশবাসী সেটা দেখেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে তার সারা শরীরে আঘাত আছে। তখনো বিথী অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নির্যাতন করিনি।’ পরে বিচারক বলেন, ‘আপনার বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে মেয়েটি আগে থেকেই অসুস্থ। তাহলে আপনি এই মেয়েকে কাজে নিলেন কেন? আর যদি আপনার এখানে আঘাত করা হয়, তাহলে আঘাতটা করলেন কেন?’

আসামি বিথী বলেন, ‘আমি তাকে নেওয়ার জন্য তার বাবাকে প্রথমে ৩০ হাজার ও পরে ২০ হাজার টাকা দিয়েছি।’

বিচারক বলেন, ‘আপনি তো তাকে কিনে নেন নাই। কিনছেন নাকি? কোর্টে সত্য কথা বলবেন। মিথ্যা বলবেন না। যদি আঘাত না করে থাকেন, তাহলে কাজে নিয়েছেন কেন? কাজে নিয়ে থাকলে কেন আঘাত করেছেন? বলেন…’

এ সময় বিথী বলেন, ‘আমি শুধু একটি আঘাত করেছি।’

পরে বিচারক বিমানের এমডি সাফিকুরের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার পদটা সমাজের উচ্চপর্যায়ের পদ। আপনার সোশ্যাল রিকগনিশন অনেক হাই। আপনার বাসায় এ ধরনের কাজকর্ম কেন হয়? আপনি নিয়মিত বাসায় আসা-যাওয়া করেন না?’

আসামি সাফিকুর নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেন। পরে বিচারক বলেন, ‘উনি (বিথী) একটি আঘাতের কথা স্বীকার করেছেন। আপনি তাকে (শিশুটিকে) সুস্থ অবস্থায় এনেছেন? আপনি কেন, এই আচরণ করলেন?’

আসামি সাফিকুর বলেন, ‘আমি শুধু মাথায় একটি আঘাত করেছি। আর আঘাত করিনি।’

শুনানির এ পর্যায়ে ভুক্তভোগী শিশুটি গত রোববার আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছে, সেটা পড়ে শোনান বিচারক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যাতে জানতে পারে, ভুক্তভোগী যে পজিশন থেকে এ স্টেটমেন্ট দিয়েছে, আমি সেটা শোনাচ্ছি।’ এরপর শিশুটিকে নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার মুখ থেকে গলা পর্যন্ত লম্বা পোড়ার দাগ, যা এখন সাদা হয়ে আসছে। কপালে লাঠি দিয়ে মারার দাগ আছে। হাতে বাঁশের লাঠির আঘাত ও পোড়ার দাগ আছে। সেই দাগ এখনো দগদগে। পায়ের রানে বড় অংশে খুন্তি দিয়ে ///ছ্যাকার দাগ আছে এবং লাঠি দিয়ে মারার চিহ্ন। হাতে ও পায়ের নখে মারার চিহ্ন আছে। পিঠে লাঠি দিয়ে অসংখ্য গুরুতর আঘাত আছে। চোখ দুটি গর্তে ঢোকানো। চোখের পাশেও কালো দাগ আছে। শরীরে জ্বর ও মাথার প্রচুর ব্যথা রয়েছে। হাসপাতাল থেকে আসার পরে সেগুলো যায়নি।

বিচারকের মুখে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে উপস্থিত আইনজীবীরা বেদনাহত হন। বিচারক জানান, জবানবন্দির ভেতরে আরও রোমহর্ষক বর্ণনা আছে। তার একটি অংশ হলো এ রকম—‘খুন্তি দিয়ে মারধর ও চোখের মধ্যে মরিচের গুঁড়া দেওয়া। তাকে বাথরুমের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। ওখানে খাবার দিত না। বাথরুমে পানির মধ্যে থাকতে থাকতে পায়ে পচন ধরে গেছে এবং পুরো শীতে শীতের পোশাক দেয়নি। ভালো কোনো খাবার দেয়নি। বাথরুমের পেস্ট খেয়েছে। টয়লেটের পানি খেয়ে থেকেছে। তাকে বাথরুম ও বাথরুমের আশপাশের জায়গায় আটকে রাখত। বাঁশের লাঠি দিয়ে মারত।’ এ রকম আরও বর্ণনা রয়েছে।

পরে বিচারক সাফিকুর রহমানের ৫ দিন, তাঁর স্ত্রীর ৭ দিন, গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের ৫ দিন ও মোছা. সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : প্রায় ২৪ হাজার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন