ঘুষ, অনিয়ম ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কার্যত জিম্মি হয়ে আছে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়। অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক অফিসটির স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমান। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে পুরো কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অলিখিত পরিচালক হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান ১৯৮৮ সালের দিকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে এখানে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিকবার তার বদলি আদেশ জারি হলেও তিনি আদালতে রিট করে অথবা বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে আবারও মুন্সীগঞ্জেই বহাল থাকেন।
সর্বশেষ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ঢাকা থেকে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর এক স্মারকে তাকে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে মাদারীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একই পদে বদলি করা হয়। আদেশে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তা না করলে স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতির কথা উল্লেখ ছিল। এমনকি তাকে ছাড়পত্রও দেওয়া হয়। কিন্তু তখনো তিনি হাইকোর্টে রিট করে মুন্সীগঞ্জেই থেকে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারী ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকের অভিযোগ, জেলার অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স ও নবায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন মিজানুর রহমান। লাইসেন্স বা নবায়নের জন্য মালিকদের ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।
সূত্র জানায়, জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। কিন্তু নির্দিষ্ট মাসিক চাঁদায় মিজানুর রহমানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে কোনো নবায়ন ছাড়াই ব্যবসা চালানো যায়। এমনকি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অভিযানের আগেই তিনি সংশ্লিষ্ট মালিকদের সতর্ক করে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নতুন কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিক স্থাপন করতে হলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়।
এদিকে সম্প্রতি ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৪২ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মিজানুর রহমান এক ব্যক্তির সঙ্গে টাকার বিষয়ে কথা বলছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, কত আনছেন? জবাবে অপর পক্ষ বলেন, ৫০ আনছি স্যার। তখন মিজানুর রহমান বলেন, “আমি তো ৭০ আনতে বলছি। ৫০ হবে না। পরে অপর পক্ষ বলেন, না স্যার, আপাতত ৫০ নিতে বলছে। তখন মিজানুর রহমান বলেন, ও আচ্ছা, ঠিক আছে।
অভিযোগ রয়েছে, মিজানুর রহমানের বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত রয়েছেন, যার ফলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে মিজানুর রহমান ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব যান। দেশে ফেরার সময় অবৈধভাবে স্বর্ণ ও সৌদি রিয়াল আনার অভিযোগে সৌদি ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরে প্রায় দুই মাস সৌদি কারাগারে থাকার পর তিনি দেশে ফেরেন। ফলে ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে দীর্ঘ সময় অফিসে যোগদান করতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক জানান, দীর্ঘদিন লাইসেন্স নবায়নের জন্য ঘুরেও কাজ হয়নি। পরে মিজানুর রহমানের সঙ্গে ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লাইসেন্স নবায়ন করতে সক্ষম হন। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতেও প্রায় ৪৫ হাজার টাকা দিতে হয়।
সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময় পর বদলির নিয়ম থাকলেও একজন কর্মচারীর ৩৫ বছর একই কর্মস্থলে থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রিটের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় অবস্থান করাও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য তৈরি করছে বলেও মত তাদের।
মো: মিজানুর রহমান বলেন, ভিডিও ফুটেজটা দেখেছি। এটা আমার বাসা ও দোকান ভাড়ার টাকা।
সিভিল সার্জন ডা. কামরুল জমাদ্দারকে মিজানুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও দেখানো হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে তিনি বলেন, স্টেনোটাইপিস্ট মিজানুর রহমানের ভাইরাল ভিডিওর বিষয়ে তাকে শোকজ করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে লিখিত ভাবে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব পাওয়ার আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
পড়ুন- ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী


