বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট সেই ৩৬ জুলাই : ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়ন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ দেখেছিল অন্যরকম জনস্রোত। নজিরবিহীন দমন-পীড়নের কারণে কোটা সংস্কারের দাবি রূপ নিয়েছিল এক দফার আন্দোলনে। সেটি ছিল ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে প্রায় সব বিরোধী দল ও মতকে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা। শুধু তা-ই নয়, পরপর প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি নির্বাচন করেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। ফলে জনমনে এমন একটি ধারণা বা ‘মিথ’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণই যে নিয়ামক শক্তি, এ কথা দেশের মানুষ প্রায় অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। জনগণের পাশাপাশি এক যুগ ধরে আন্দোলন ও মামলা-হামলার মুখে থাকা বিএনপির একাংশের মধ্যেও এমন ধারণা বা বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিল। কারণ, একবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং দুবার নির্বাচন বর্জনের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছিল দলটির মধ্যে।

তবে, দোর্দণ্ড প্রতাপে টানা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ চালানো সেই শেখ হাসিনাকেই ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। ৫ আগস্টের সেই চূড়ান্ত দিনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ গণঅভ্যুত্থান সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশকে প্রবলভাবে ধাক্কা দিয়েছে, অনেক কিছু ভেঙেচুরে দিয়েছে।

বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে কেবল স্থাপনা নয়, প্রচলিত ধারণা, চিন্তা-বিশ্বাস, দর্শন, মূল্যবোধ, গতানুগতিক রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের আবহ সৃষ্টি করেছে। নতুন এক সম্ভাবনা ও শঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশ, তখন কেউ নির্বাচনেই দেখছেন রাজনৈতিক সমাধান। তবে, জুলাইয়ের চেতনা ও জনাকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার, দৃশ্যমান বিচার শুরুর পরই নির্বাচনের পক্ষে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল মূলত ৬ আগস্টে। তবে, ৪ আগস্ট বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেওয়া এক বার্তায় তা একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।

নতুন কর্মসূচি নিয়ে ফেসবুকে তিনি লেখেন, “পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে আমাদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করা হলো। আগামীকালই (৫ আগস্ট) সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কার‌ফিউ ঘোষণা করে। একই স‌ঙ্গে তিন দিনের (৫, ৬ ও ৭ আগস্ট) সাধারণ ছু‌টি ঘোষণা ক‌রে সরকার। এ অবস্থায় ৫ আগস্ট সকা‌ল থেকে রাজধানীর সড়কগুলো ছিল ফাঁকা। মূল সড়কে মানুষের চলাচল ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

৪ আগস্ট সন্ধ্যার পর গণভবনে আরেকটি বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, র‍্যাব ও আনসার/ভিডিপির প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সেনাপ্রধান ও অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা ঢাকা রক্ষার বিষয়ে আবারও হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকার উদ্দেশে জনস্রোত শুরু হয়। উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গি থেকে হেঁটেই ছাত্র-জনতার স্রোত সামনে এগিয়ে আসতে থাকে। উত্তরায় আটকাতে না পেরে খিলক্ষেত ও বনানী এলাকায় পুলিশ চেষ্টা করে জনস্রোত ঠেকানোর জন্য। তবে, সেটা সম্ভব হয়নি।

কারণ, ৫ আগস্ট সকালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা মূলত দাঁড়িয়েছিলেন। আগের রাতে সরকারের করা পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা অর্পিত ভূমিকা পালন করেননি।

সকাল ১০টার পর থেকে কারফিউ ভঙ্গ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে আসেন ছাত্র-জনতা। সকাল ১০টার দিকে রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে বাড্ডায় যাওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়ে পুলিশ। এতে শিক্ষার্থী-বিক্ষোভকারীরা আহত হন। ওই এলাকায় সকালে গুলিতে আহত বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে, সকাল ১০টার আগে ও পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও জনতা। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও গুলি করে তাদের সরিয়ে দেয়।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় হাজারো মানুষ রাস্তায় অবস্থান নেন। যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অবস্থান নেয় পুলিশ। সাঁজোয়া যানসহ সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখা যায় সেখানে। বেলা ১১টায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

সরকারের নির্দেশে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়। অন্যদিকে, বেলা ১১টার পর ঢাকার উত্তরায় বিএনএস সেন্টারের সামনে হাজারো আন্দোলনকারী রাস্তায় অবস্থান নেন। দুপুর ২টার দিকে ছাত্র-জনতা গণভবন ও সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করেন।

বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে জানায়, চলমান পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুর আড়াইটায় একটি সামরিক হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা উড্ডয়ন করেন। এ সময় তার ছোট বোন শেখ রেহানা সঙ্গে ছিলেন। শেখ হাসিনা যাওয়ার আগে একটি ভাষণ রেকর্ড করে যেতে চেয়েছিলেন। তবে, তিনি সে সুযোগ পাননি।

বিকেল ৩টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিটিভিতে ঘোষণা দেন– শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং দেশ ছেড়েছেন। পরে সেনা সদর দপ্তরে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

শেখ হাসিনার পতন হয়েছে— এমন খবরে গণভবনে ঢুকে পড়েন অসংখ্য মানুষ। তারা গণভবনের মাঠে উল্লাস প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : স্বৈরাচারমুক্ত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই ছিল অভ্যুত্থানের লক্ষ্য : প্রধান উপদেষ্টা

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন