মাত্র পাঁচ টাকা কম ভাড়া দেয়া নিয়ে বরিশাল সরকারী বিএম কলেজ শিক্ষার্থী ও বাস শ্রমিকের দ্বন্দ্বে নগরীর কেন্দ্রীয় নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে তুলকালাম কান্ড ঘটেছে। অন্তত দুই শতাধিক বাস ভাংচুর, একটিতে অগ্নিসংযোগ, অর্ধশত কাউন্টার ও তিনটি মোটর সাইকেল ভাংচুর ও কাউন্টার থেকে অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ এলাকায় এই তান্ডব চলে।
রাত সাড়ে ৯টার পর সেনাবাহিনী এসে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিয়ে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা নিয়ন্ত্রনে নেয়। পরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাত্র ৫ টাকার ভাড়া নিয়ে বিএম কলেজ শিক্ষার্থী ও বাস শ্রমিকদের মধ্যে তর্ক ও হাতাহাতি হয়। পরে ১০০/১৫০ শিক্ষার্থী এসে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে থাকা বাস, সকল কাউন্টারসহ যাবতীয় স্থাপনা ভাংচুর করে। এ সময় নূর পরিবহন নামে একটি বাসেও অগ্নিসংযোগ করে। কাছাকাছি ফায়ার সার্ভিস থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রনে এনেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বাস টার্মিনালে তান্ডব চালিয়েছে। তারা নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের গোল চত্বরে অবস্থান নিয়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছে। বিএম কলেজ উপাধ্যক্ষ এসে শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা শান্ত হয়নি। সড়ক অবরোধ করায় বরগুনা, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর থেকে আসা যানবাহন আটকা পড়ে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে শিক্ষার্থীরা নথুল্লাবাদ বাসটার্মিনাল ছেড়ে গিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, যেভাবে বাস, কাউন্টার ভাংচুর করা হয়েছে, তাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, বাসের ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে তর্ক-বির্তক হয়। ঘটনার সাথে সাথে আমাদের এক অফিসার রেসপন্স করেছে। ছাত্র ও শ্রমিকদের নিয়ে সমাধানের একটি পথে যাচ্ছিলো। উত্তেজনাকর একটি কথার কারনে সমাধান হয়নি। আস্তে আস্তে ঘটনার বিস্তার লাভ করেছে বেশি। আমাদের অন্যান্য বাহিনী বাধার কারনে আসতে পারেনি। তবে আহত হওয়ার কোন ঘটনা ঘটেনি। কতটি বাস ভাংচুর করা হয়েছে, তার সঠিক হিসাব এখনো করতে পারেনি।
ওসি বলেন, প্রথম থেকেই পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিলো। প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের থাকলেও পরে আর নিয়ন্ত্রন রাখতে পারেননি।
শ্রমিক আল আমিন বলেন, বরিশালের হিজলা থেকে হিমেল হিরক পরিবহনের একটি বাস যাত্রী নিয়ে নগরীর নথুল্লাবাদে আসে। ৫ টাকা ভাড়া নিয়ে ছাত্রদের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। ছাত্ররা বাসের ড্রাইভারকে মারছে। তারা যদি মার খায়, তাহলে তারাও তো মারবে। এরপর ছাত্ররাসহ দুস্কৃতিরা এসে বাস ভাংচুর করেছে। টার্মিনালে যত বাস আছে, নরমালে তিনশ সাড়ে তিনশ সব ভাংচুর করেছে। টার্মিনালে লোকাল ও দুরপাল্লার অর্ধশত কাউন্টার ভাংচুর এবং টাকা পয়সা নিয়ে গেছে।
বিএম কলেজের সমাজকল্যান বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু বলেন, আমাদের এক শিক্ষার্থী যখন হেনস্থা হয়েছে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমরা জিজ্ঞেস করতে আসি। তখন শ্রমিকরা আমাদের পাল্টা হুমকি দিয়েছে গালিগালাজ করেছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেছে। হামলার বিচার চাওয়ার জন্য আমরা নথুল্লাবাদ অবস্থান করছি। যতক্ষন পর্যন্ত প্রশাসন বিচার না করবে , তাদেরকে আইনের আওতায় না আনবে, শিক্ষার্থী, জনবান্ধব ও যাত্রী বান্ধব না হবে। ততক্ষন পর্যন্ত নথুল্লাবাদ না ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
বিএম কলেজ অধ্যক্ষ শেখ তাজুল ইসলাম বলেন, এখানে একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। হাফ ভাড়া কেন্দ্র এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছে। সেই ঘটনা তার বন্ধুরা জানতে এসেছে। তাদের উপরও হামলা করা হয়েছে। বিএম কলেজের ছাত্ররা সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে এখানে এসেছে। আমি ওদের কথা দিয়েছি, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে বরিশালের সকল প্রশাসন বাস মালিক সমিতি নিয়ে সুরাহা করা হবে।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সদস্য ফয়সাল আহম্মেদ নূর বলেন, স্বরুপকাঠি কাউন্টারের সামনে কালকের সকালের প্রথম ট্রিপের জন্য আমার মালিকানাধীন নূর পরিবহন দাড়ানো ছিলো। কয়েকশ লোকজন হঠাৎ করে গাড়িটি ভাঙচুর করে, কিছুক্ষণ পর আমার গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বরিশালে এমন ঘটনা কোনো সময়ই ঘটেনি।
বরিশাল জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মীরা হোসেন বলেন, হিমেল হিরক গাড়ির ড্রাইভার হিরনকে ব্যাপক মারধর করা হয়। তারপরও বিষয়টি সমাধানের দিকে যাচ্ছিলো, এর মধ্যে ছাত্রদের মধ্যে একজন উত্তেজনাকর কথা বললে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যায়। শতশত ছাত্র না সন্ত্রাসী বলতে পারবো না, তারা সব বাস ভাঙচুর করেছে। আমরা শুক্র ও শনিবারও হাফ ভাড়া নেই। তারপরও যখন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তখন আর হাফ ভাড়া চলবে না। আর এমন ভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে তাতে বরিশাল থেকে কোনো রুটেই বাস চলাচল করানো সম্ভব হবে না। কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারেফ হোসেন বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে আড়াই ঘন্টা নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে তান্ডব চালানো হয়েছে। টার্মিনালে সকল বাস ভাংচুর করেছে। কাউন্টার ভাংচুর করেছে। টাকা পয়সা লুট করেছে। হাজারখানেক লোক ছিলো। ছাত্ররা না কারা ছিলো এখন পর্যন্ত বলতে পারি না। কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাও জানি না। রোববার সকাল থেকে কোন বাস চালানো যাবে কিনা সন্দেহ আছে। কারন এগুলো সব মেরামত করতে হবে।
এদিকে বাসগুলোতে হামলার নেতৃত্বের অভিযোগ উঠেছে বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের সহ সভাপতি তারিকুল ইসলাম তরিক ও বিএম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সোহানের বড় ভাই যুবদল নেতা অহিদুল ইসলাম রুবেল এর বিরুদ্ধে। শ্রমিকদের অভিযোগ এরাই ছাত্রদের উস্কানী দিয়েছে।
পড়ুন : টাঙ্গাইলে বাসের চাপায় মোটরসাইকেল চালক নিহত, আরোহী আহতবিক্ষুব্ধ জনতার বাসে আগুন


