১০/০২/২০২৬, ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
20 C
Dhaka
১০/০২/২০২৬, ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন: বিএনপিতে প্রার্থীজট, জামায়াতের একক প্রার্থী

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বরেন্দ্রভূমি নাচোল, প্রাচীন জনপদ গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলাতে বইছে ভোটের হাওয়া। এ তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন। আসনটিতে চলছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। ব্যানার ফেস্টুনের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণায় ব্যস্ত সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আসনটি বিএনপি’র ‘রিজার্ভ আসন’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সব নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে এখানকার ভোটাররা। এ আসনটিতে ভোটের মাঠে আধিপত্য কেবল বিএনপিরই। মনোনয়ন পেলেই সংসদে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত- এই ধারণা থেকে অনেক বিএনপি নেতার চোখ এই আসনে। তাই নিজেদের ঘাঁটিতে বিএনপি’র অন্তত ৮ জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা নানা মত ও পথে বিভক্ত। এ সুযোগে সুসংগঠিতভাবে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী ভোটের মাঠে তার কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে তা এখন আলোচনায়। যদিও এবার জামায়াতে ইসলামী ভাগ বসাতে চায় বিএনপির ভোটব্যাংকে। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তৎপরতা নেই।

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই আসনে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন। প্রয়াত মঞ্জুর হোসেন শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৮ সালের কারচুপির ভোট ও ২০১৪ সালে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগ এই আসনে বিজয়ী হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবার বিএনপির দখলে যায় এই আসন। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনেও আসনটিতে এমপি হন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম।

এ আসনের নির্বাচনি মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও বিএনপি নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। দলটির বড় সমস্যা দলের নেতাদের মধ্যে অনৈক্য। দলের মনোনয়ন ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র কোন্দল, যা তৃণমূলকে বিভক্ত ও হতাশ করছে। বিএনপি এমন নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তর্কোন্দল সুসংগঠিত দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম এবারও নির্বাচনমুখী তৎপরতা শুরু করেছেন। দলটির বর্তমান নেতত্বে তার সঙ্গে না থাকলেও তিন উপজেলার সাবেক নেতাকর্মীরা এ আসনে আমিনুল ইসলামকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে তুলে ধরে গণসংযোগ শুরু করেছেন। গতবছরই প্রার্থিতার বিষয়ে সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেছেন, তিনি মনোনয়নের গ্রীণ সিগন্যাল পেয়েছেন। এছাড়াও আমিনুল ইসলামের আর্থিক সক্ষমতা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পুরোনো যোগাযোগকে শক্তি হিসেবে দেখছেন তার সমর্থকরা। তবে রাতের ভোটের অবৈধ সংসদে গিয়ে দলের পক্ষে তেমন ভুমিকা রাখতে পারেননি। দুঃসময়ে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে না থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে জোরালো।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। এই নারী নেত্রীর ছবি সম্বলিত পোস্টার শোভা পাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিভিন্ন এলাকায়। হেভিওয়েট এই নেত্রীর মানোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি হঠাৎ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাল্টে দিয়েছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের হিসাব-নিকাশ। কারণ, ৯০ এর স্বেরাচার বিরোধী আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন তিনি। তৃণমূল থেকে রাজপথ- সর্বত্র সরব উপস্থিতি রয়েছে তার। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আলোচিত বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদের স্ত্রী। দলের মিছিল-মিটিংয়েও থাকেন সম্মুখভাগে। কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পিছিয়ে থাকেননি কখনো। টকশোতে মাতিয়ে রাখেন বিভিন্ন টিভি চ্যানেল। এ রকম সর্বব্যাপী তৎপরতার কারণে দলের সব পর্যায়ে পরিচিত মুখ পাপিয়া। পতিত হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে তার ব্যাপক সক্রিয়তার বিষয়টি কতটা ছিল, এর একটা উদাহরণ হতে পারে তার বিরুদ্ধে পুলিশের মামলার সংখ্যাটি। প্রায় ৮০টি মামলা হয়েছে এই নারীনেত্রীর বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ১৯৮৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া হল শাখার সভাপতির দ্বায়িত্বপালন করেন তুখোড় বক্তা পাপিয়া। পরে পরপর দুইবার হল শাখার ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সবশেষে দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাকে দেয়া হয় সহ-মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদকের পদ।
   
এদিকে, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসউদা আফরোজ হক সুচি। তিনি গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। প্রচার-প্রচারণায় বড় শক্তি তার বাবা নাচোল উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম মজিদুল হক। এই সূচি বিএনপির সাবেক এমপি আমিনুল ইসলামের ছোট ভাইয়ের বউ। এবার ভাসুরের সঙ্গে মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় নেমেছেন এই নারী নেত্রী।

এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম তুহিন, গোমস্তাপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সেন্টু, রহনপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র তারিক আহমেদ, বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের সাবেক ভিপি মু. ইমদাদুল হক মাসুদ, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ মঞ্জুর হোসেনের ভাতিজা সৈয়দ আতাউর হোসেন মিলন ও বিএনপি নেতা এনায়েত করিম তোকি। তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ৩১ দফার লিফলেট বিতরণ ও ভোটারের কাছে দোয়া চাইছেন।

মাসউদা আফরোজ হক সুচি বলেন, তিন উপজেলায় দলের নির্যাতিত, মামলা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। স্থানীয় তৃণমূল বিএনপি ও কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। এ কারণে দল অবশ্যই আমাকে বিবেচনা করবে।

বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী তারিক আহমেদ বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে বিএনপিকে সুসংগঠিত করে রেখেছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ৩১ দফা নিয়ে মাঠে কাজ করছি। তিনি বলেন, বিএনপির মনোনয়ন পেলে আসনটিতে বিজয় উপহার দিতে পারবেন তিনি।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে আসার পর চার দশক ধরে দলের প্রয়োজনে রাজপথে আছি। এখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায়ের জন্য লড়াই করছি। আমাকে এখন দেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হয়, কথা বলতে হয়। ১৯৯১ সাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতিটি আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তারা আমার প্রতি বিশ্বস্ত। আমারও জনগণের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা আছে। দলীয় মনোনয়ন পেলে নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট আসনকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গড়ে তুলব।

এদিকে বিএনপির অগোছালো পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত গোছানোভাবে প্রচার চালাচ্ছে। অনেক আগেই এ আসনে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ড. মু. মিজানুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে দলটি। জামায়াতের নেতাকর্মীরা দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করছে। বিএনপির কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে তারা ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে পারে বলে ধারণা করছেন দলটির সমর্থকরা। জামায়াতের প্রার্থী ড. মু. মিজানুর রহমান বলেন, দলের প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তিনি মাঠে রয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার কথাও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা: ২৫ কোটি টাকার টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ

এস/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন