ভাদ্রের সকাল। আকাশজুড়ে তখন বৃষ্টির উন্মত্ত অর্কেস্ট্রা। শহরের শরীর ভিজে ওঠে জলকাদার স্নিগ্ধ নৃত্যে। ভিজে মাটির গন্ধে বাতাস হয়ে ওঠে মাদকতাময়। দিগন্তে কুণ্ডলী পাকানো মেঘ নীরব প্রশ্ন তোলে— কবিতা কি কেবল কাগজের পাতায় বন্দি, নাকি শহরের মতোই সে শ্বাস নেয় জীবনের ভেতর?
অন্তিম দুপুরে বৃষ্টি থেমে গেলেও সূর্যমুখ রয়ে যায় অদৃশ্য। স্যাঁতস্যাঁতে সেই আবহে, প্রাক-সন্ধ্যায় দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সম্মেলন কক্ষে জমে ওঠে অন্যরকম এক উচ্ছ্বাস। সেখানে দীপিত হয় ভাঁজপত্র উচ্ছ্বাস-এর যুগপূর্তি বৈঠকী আড্ডা। প্রয়াত কবি মাহমুদ আখতার ও প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিকদের উৎসর্গিত নীরবতা যেন মুখবন্ধের মতো স্পর্শ করে সমবেত হৃদয়কে। এরপর গৌতম সেন সৌরভের স্বাগত ধ্বনি জ্বালিয়ে তোলে আড্ডার প্রথম প্রদীপ। সেমিনারের মুখ্য বক্তা অধ্যাপক তারেক রেজা উচ্চারণ করেন কবিতার দীর্ঘ পথচলার মর্মবাণী— ছোটকাগজ আর ভাঁজপত্র কেবল প্রকাশনা নয়, নবীন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার অগ্নিশিখা। এর পরপরই কবি-গবেষক মাসুদুল হকের প্রজ্ঞাধারা প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে তোলে দীপ্ত আলোকধারায়। সম্পাদক তুষার শুভ্র বসাকের স্মৃতিচারণ মুহূর্তটিকে সোনালি স্মৃতিফলক করে তোলে।
তারপর আসে বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। বিধান দত্তের সঞ্চালনায় এবং সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চুর সভাপতিত্বে উন্মোচিত হয় যুগপূর্তি সংখ্যা— দ্বাদশী। অতিথি কণ্ঠে ঝরে পড়ে আশ্বাসের আলো— জলিল আহমেদ, গোলাম নবী দুলাল, নিরঞ্জন রায় ও মামুনুর রশিদ চৌধুরীর উচ্চারণে দীপ্ত হয়ে ওঠে সাহস ও সমবেদনার মশাল। এরপর মঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সম্মান প্রদানের দৃশ্য। উচ্ছ্বাস সম্মাননা–২০২৪ প্রদানের সেই পর্বে গুণী দম্পতি মাসুদুল হক ও সিরাজাম মনিরার সম্মাননা ছুঁয়ে দেয় মানবিক আবেগের গভীরতম স্তর।
সম্মাননা পর্ব শেষ হতেই সন্ধ্যার আবহে কবিতার সুর নেমে আসে বাতাসের মৃদু তরঙ্গে। আবৃত্তির দীপ্তি জেগে ওঠে কণ্ঠে কণ্ঠে— সিরাজাম মনিরা, মাসুদা বেগম, পপি দাস হাসদাক, শুক্লা সাহা, ইয়াসমিন আরা রানু, আজহারুল আজাদ জুয়েল, শিশির রায়, আনোয়ার হোসেন, নিরঞ্জন রায়, তরিকুল আলম, কাশি কুমার দাস, ওয়াসিম আহমেদ শান্ত— প্রতিটি উচ্চারণে ফুটে ওঠে কবিতার অন্তর্লীন আস্থা। দর্শকের হৃদয়ে আড্ডার আবহ আরও গভীর হয়ে ওঠে।
শেষপর্বে সংগীত। প্রশান্ত কুমার রায়ের তত্ত্বাবধানে মঞ্চ ভরে ওঠে সুরে। মৃন্ময়ী রায় মৌ, প্রিয়াংকা দাস চৈতি, ফরহাদ আহমেদ ও শফিকুল ইসলাম বকুলের কণ্ঠ মিলিত হয় আনোয়ার হোসেন আঙ্গুরের আঙুলে তবলার অনুরণনে। কাব্যছন্দ যেমন দর্শক-হৃদয়ে বয়ে আনে প্রশান্তির আর্তি, তেমনি শহরের ক্লান্ত ভিজে শরীর খুঁজে নেয় গানের উষ্ণ সান্ত্বনা।
সবশেষে সম্পাদক হৃদয় ভরে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আগমন, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, প্রিয়জনের সহযোগিতা— সব মিলিয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে জীবনেরই রূপক। উচ্ছ্বাস তাই কেবল ভাঁজপত্র নয়; সে এক আত্মার যাত্রা, যেখানে প্রতিটি কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ভালোবাসা আর আস্থার অমর সঙ্গীত। এই উচ্ছ্বাসকে সঙ্গী করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা রয়ে যায়, কারণ এই উৎসব, এই বৃষ্টিভেজা দিন— সবই মিলেমিশে হয়ে ওঠে কবিতার সত্তার চিরন্তন অনুষঙ্গ।
পড়ুন: পিরোজপুরে মহা সড়ক অবরোধ করে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ মিছিল
দেখুন: ড. ইউনূসকে ট্রাম্পের চিঠি, বাংলাদেশি পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ
ইম/


