ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যু্ক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে না তেহরান। আসন্ন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এক বিশেষ ভাষণে এ কথা বলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুতে শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রস্তাব পাস হয়। যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি না হয়, তাহলে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানের ওপর ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহাল হবে যা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির আওতায় প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এই নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে মঙ্গলবার ইথ্রি হিসেবে পরিচিত ইউরোপের তিন দেশ জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বৈঠক হয় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গেও।
এসব বৈঠকে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা ইরানকে বলেছেন, যদি তেহরান এখনও স্ন্যাপব্যাক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চায়, তাহলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নিতে হবে। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ইথ্রি-এর দৃষ্টিতে, এই ‘কার্যকর পদক্ষেপে’র মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের সরাসরি আলোচনা শুরু করা এবং আইএইএ-এর জন্য সমস্ত ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার দেয়া।
এদিকে ইরানের রাজনীতিকদের সংস্কারবাদী গোষ্ঠীগুলোও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সরাসরি আলোচনা চায়। এমন পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার বিশেষ ভাষণ দেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। তার এই ভাষণ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়।
খামেনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে সমাধান স্বীকার করা শুধুই আরও চাপ ও অনন্ত দাবির পথ উন্মুক্ত করে। তিনি বলেন, ‘যে জাতি সম্মানের অধিকারী, তারা হুমকির অধীনে কোনো আলোচনায় বসবে না, এবং কোনো বুদ্ধিমান নীতি নির্ধারক এমন পদক্ষেপ সমর্থন করবে না।
ভাষণের প্রথম অংশে তিনি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরেন—যাতে কৃষি, শিল্প, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, পুষ্টি, গবেষণা ও শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন এই প্রযুক্তি অর্জন করিনি এবং অন্যরা আমাদের চাহিদা মেটাতে চাইনি, তখনও কয়েকজন নিবেদিত ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা এবং বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় আমরা ত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ে এই উদ্যোগ শুরু করি। আজ আমরা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছি।’
খামেনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে ১০টি দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সক্ষম, যার মধ্যে একটি হল ইসলামী ইরান। অন্য ৯টির কাছে পারমাণবিক বোমা আছে। আমরা বোমা রাখি না, রাখব না, কিন্তু সমৃদ্ধি আমাদের আছে।’
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘এ পর্যন্ত চাপের মুখে আমরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি ছাড়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও করব। একইভাবে, অন্য যে কোনো বিষয়েও আমরা চাপের বিরুদ্ধে দৃঢ় থেকেছি।’
খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক আলোচনার আহ্বানকে একপ্রকার বাধ্যতামূলক দাবির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘আজ তারা বলে পরমাণু সমৃদ্ধি চলবে না, আগামীকাল ক্ষেপণাস্ত্র বা কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন হুমকি চাপানো হবে।’
তিনি অতীত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বলেন, ‘দশ বছর আগে আমরা পরমাণু চুক্তি করেছিলাম, যেখানে পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ ও সমৃদ্ধ উপকরণ নষ্ট করা হয়, বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থায় ইরানের ফাইল স্বাভাবিক করা হয়। আজ দশ বছর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, বরং সমস্যাগুলো বেড়েছে।’
খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মিথ্যা, যখনতখন সামরিক হুমকি এবং সোলাইমানি হত্যাসহ হামলার মতো কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে আলোচনা করা সম্ভব নয়।’ তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ একটি মৃতপ্রায় পথ।’
সর্বশেষে তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নেয়া এবং রক্ষা করার একমাত্র পথ হলো সামরিক, বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দিক থেকে শক্তিশালী হওয়া। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা শক্তিশালী হই, যুক্তরাষ্ট্র আর হুমকি দিতে পারবে না।’
খামেনি দেশের ঐক্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ঐক্য ১২ দিনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে শত্রুর ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। তিনি বলেন, ‘আজকের ইরান সেই ইরান যা ১২-১৩ জুনে শক্তিশালী জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে শত্রুর মোকাবিলা করেছে, এবং ঐক্য এখনও বজায় রয়েছে।’
পড়ুন : এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলো বিশ্বের ১৫১টি দেশ


