১০/০২/২০২৬, ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
18 C
Dhaka
১০/০২/২০২৬, ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে ২৩ উদ্যোক্তা পেলেন ঋণ সুবিধা

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প। বিশেষ করে উদীয়মান তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ আজ দেশের সার্বিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবন কর্মসূচি (SCIPI) এ উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহে মাসব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ শেষে ২৩ জন উদ্যোক্তাকে ঋণ সুবিধা প্রদান করেছে এনসিসি ব্যাংক। এই উদ্যোগ শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের উৎসাহই জোগাচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতে তাদের ব্যবসা টেকসই করতেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

শনিবার সকালে ময়মনসিংহ নগরীর মাসকান্দা এলাকায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মাসব্যাপী ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি’র সমাপনী হয়। সেখানে ২৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে থেকে ২৩ জনকে মোট ৩৯ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়।

বিজ্ঞাপন


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ময়মনসিংহ) মো. কাউছার মতিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসআইসিআইপি (SCIPI) প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন এনসিসি ব্যাংক পিএলসি-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির আনাম।

এছাড়াও স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রশিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল অনুপ্রেরণামূলক এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার মতো এক সফল আয়োজন।

প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তাদের হাতে সনদ তুলে দেওয়ার সময় অতিথিরা বলেন, সনদ কেবল একটি কাগজ নয়—এটি উদ্যোক্তার পরিশ্রম, উৎসাহ ও ভবিষ্যতের প্রতীক। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা যে জ্ঞান অর্জন করেছেন, সেটিকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাজারে এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হবে।

ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ৩৯ লাখ টাকার এই ঋণ প্রাপ্ত উদ্যোক্তারা এখন তাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রসারিত করতে পারবেন। এর ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (SME)। বড় শিল্প স্থাপনে সময় ও পুঁজি বেশি প্রয়োজন হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে কম খরচে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। এনসিসি ব্যাংক সব সময় SME খাতের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. কাউছার মতিন বলেন— “উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। তাদের দক্ষতা বাড়াতে এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমাতে প্রশিক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো যখন ঋণ সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগ নেয়, তখন উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়।”

বিশেষ অতিথি মো. নজরুল ইসলাম বলেন—”উদ্যোক্তা তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ শিগগিরই উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা রাখা জরুরি।”

এনসিসি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির আনাম তার বক্তব্যে বলেন—”আমরা চাই প্রতিটি জেলায় নতুন উদ্যোক্তার জন্ম হোক। উদ্যোক্তারা যদি শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে।”

মাসব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, বিপণন কৌশল, ডিজিটাল মার্কেটিং, আর্থিক পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক ঋণ ব্যবহারের কৌশলসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।

এছাড়াও উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ধারণা তৈরি, বাজার বিশ্লেষণ, গ্রাহক চাহিদা বোঝা, মানসম্মত পণ্য উৎপাদন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা চর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ সেশন রাখা হয়েছিল, যাতে তারা ব্যবসা পরিচালনায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেন।

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, এই প্রশিক্ষণ তাদের জন্য ছিল একটি দিকনির্দেশনা।

স্থানীয় এক নারী উদ্যোক্তা বলেন—”আমি হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করি। আগে ব্যবসা পরিচালনার অনেক কিছুই জানতাম না। কিন্তু এই প্রশিক্ষণে এসে শিখেছি কীভাবে খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে পণ্য বাজারজাত করতে হয় এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির সুযোগ তৈরি করতে হয়। এখন ব্যাংকের দেওয়া ঋণ দিয়ে ব্যবসা আরও বড় করার পরিকল্পনা করছি।”

অন্য এক তরুণ উদ্যোক্তা আরিফউর রহমান জানান—”আমি আইটি সার্ভিস নিয়ে কাজ করি। প্রশিক্ষণের ফলে শিখেছি কীভাবে আমার ব্যবসার পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ব্যাংকের দেওয়া ঋণ দিয়ে একটি ছোট অফিস ভাড়া নেব এবং নতুন কিছু কর্মী নিয়োগ করব।”

প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত উন্নয়নেই সাহায্য করছে না, বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উদ্যোক্তারা যখন নতুন ব্যবসা শুরু করবেন বা ব্যবসার পরিসর বাড়াবেন, তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় কাঁচামালের চাহিদা বাড়বে, ফলে কৃষক ও উৎপাদকরাও উপকৃত হবেন।

একই সঙ্গে উদ্যোক্তারা যখন স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করবেন, তখন বাইরের পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। এতে অর্থ দেশের ভেতরেই ঘুরতে থাকবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

বক্তারা অনুষ্ঠানে আরও জানান, এ ধরনের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকবে। শুধু ময়মনসিংহ নয়, দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় ধাপে ধাপে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হবে। এনসিসি ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকও SME খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারেন।

উদ্যোক্তাদের বিকাশ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ময়মনসিংহে আয়োজিত মাসব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তীতে ২৩ জন উদ্যোক্তাকে ৩৯ লাখ টাকার ঋণ প্রদান প্রমাণ করে, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

উদ্যোক্তারা যদি এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন, তবে শুধু নিজেদের জীবন-মান উন্নত করবেন না, বরং দেশের লাখো মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দেবেন।
বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি হবে এই উদ্যমী তরুণ ও নারী উদ্যোক্তারা। তাদের হাত ধরে গ্রাম থেকে শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানী পর্যন্ত গড়ে উঠবে নতুন নতুন উদ্যোগ, যা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

পড়ুন : ময়মনসিংহে আনন্দ-বেদনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন