নাড়ু, সন্দেশ, মুড়ি চিড়ার মোয়া ও হড়েক রকমের মিষ্টি জাতীয় খাবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরের সনাতনীদের ঘরে ঘরে চলছে কোজাগরি লক্ষ্মীপূজো। পঞ্জিকার তিথি অনুযায়ী প্রতি বছর আশ্বিনী পূর্ণিমায় সনাতন ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী এ লক্ষ্মীপূজোটি ঘরে ধন, ঐশ্বর্য ও শান্তির প্রত্যাশায় করা হয়ে থাকে।
৬ অক্টোবর সোমবার শহরসহ পাড়া মহল্লার ঘরে ঘরে মেয়েরা দেবী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আল্পনা আঁকায় ব্যস্ত রয়েছেন।
বাহের খলিশাডুলীর গৃহবধূ বাসনা রানী দত্ত বলেন,আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে ভক্তদের ঘরে ঘরে ধন, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও শান্তির বর নিয়ে নেমে আসেন। বেশিরভাগ পরিবারে ঘরোয়া পরিবেশেই দেবী লক্ষ্মীর পূজো করা হয়। গৃহিণীরা ধান, চাল, কুমড়ো ও ফলমূল দিয়ে দেবীকে নিবেদন করেন। পূজার আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা ও ধান-চাল দিয়ে আলপনা আঁকা ঐতিহ্যের অংশ। পূজার সময় পাঠ করা হয় ‘শ্রীশ্রী লক্ষ্মীচরিত’, আরতি শেষে পরিবারের সবাই মিলে প্রসাদ খেয়ে থাকেন।
শহরের কালীমন্দির প্রাঙ্গণে দেখা গেছে, নতুন পাটির ঝাঁপি, ধান, চাল, কলা, নারকেল, চিনি, মিষ্টি, আতপ চাল, ফুল, প্রদীপসহ পূজো উপকরণগুলোর ব্যাপক বিক্রি হচ্ছে। কেউ প্রতীমা কিনলেও অনেকে কলা বউ কিনে যাচ্ছেন।
লক্ষ্মী পূজাকে কেন্দ্র করে গত দুই দিন ধরেই চাঁদপুরের বড় বাজারগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। মিষ্টির দোকানগুলোয় ছিল রসগোল্লা, সন্দেশ, পায়েস, নাড়ু ও ছানার নানা রকমের মিষ্টিজাত পণ্যের বেচাকেনা। ফুলের দোকানগুলোতেও ছিল ভিড়। বিশেষ করে গাঁদা ও শিউলি ফুলের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।
পাটের ঝাঁপি, বাঁশের চালুনি, ধানের ছড়া, মাটির প্রদীপ ও নতুন ধান-চালের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন ব্যস্ত। বিক্রেতা মৃণাল কান্তি দাস বলেন, প্রতি বছরই এই সময় লক্ষ্মী পূজার জন্য ভালো বিক্রি হয়। এবার দাম কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি তেমন কমেনি। সবাই চায় দেবীর আরাধনায় কোনো ঘাটতি না থাকুক।
চাঁদপুর জেলা যুব ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব পার্থ গোপাল দাস বলেন, এদিন গৃহিণীরা ঘরবাড়ি ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে তুলেন। মাটির উঠোনসহ ঘরের ভিতরে আলপনা এঁকেছেন। সাজিয়ে তুলেন পূজার মণ্ডপ ও ঘরের পূজাস্থল। সন্ধ্যা নামতেই প্রদীপ ও ধূপের ঘ্রাণে আর ফুলের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠে প্রতিটি সনাতনীর ঘর।
গৃহবধূ যমুনা রানী বলেন, লক্ষ্মীদেবী আসেন পরিচ্ছন্ন ঘরে। তাই আমরা দিনভর ঘরসহ পুরো বাড়ী পরিষ্কার করি। এরপর নতুন চাল, নতুন ধান দিয়ে পূজা দিই। বিশ্বাস করি, এই পূজার মাধ্যমে ঘরে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।
পুজোর পুরোহিত বিমল চক্রবর্তী বলেন, লক্ষ্মী পূজা হচ্ছে একটি শুভ শক্তির আরাধনা। এটি মানুষকে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন, পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে চলার বার্তা দেয়।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান যুব ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অমরেশ দত্ত জয় বলেন, কোজাগরী শব্দের অর্থ—‘কে জেগে আছো’। এই রাতে দেবী পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কে জাগরিত আছো?”— অর্থাৎ কে তাঁর পূজায়, সৎসাধনায় নিমগ্ন। যিনি উত্তর দেন, তাঁর ঘরেই প্রবেশ করেন দেবী লক্ষ্মী। তারপর বরদান করেন সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য। তাই এই রাতে সনাতনী ভক্তরা জেগে থাকেন। ভক্তিগীতি, আরতি, মন্ত্রপাঠ ও আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমে দেবী লক্ষ্মীকে গৃহে প্রবেশের আহ্বান জানান।
অমরেশ দত্ত জয় আরও বলেন, আমরা প্রার্থনা করছি যেন দেবী লক্ষ্মী সবার ঘরে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আনেন। এই পূজোর উৎসবের আমেজ আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
পড়ুন : বিএনপিকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোষ্ট শেয়ার করে পদ হারালেন চাঁদপুরের জামায়াত নেতা


