সীমান্ত ঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। অসময়ে নদী ভাঙন, খড়া, অতি বৃষ্টি ও বন্যায় বছরের বেশির ভাগ সময় জীবন জীবিকা নির্বাহ নিয়ে বাঁধার মুখে পড়তে হয় তাদের। বিশেষ করে অসময়ে নদী ভাঙন অন্যতম কারন হিসাবে দেখছেন এখানাকার মানুষজন।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন সৃষ্ট সমস্যা থেকে উত্তরণে বিকল্প পথ খুঁজছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে,দীর্ঘ দিন চেষ্টা ও অপেক্ষার পরও যখন নদী ভাঙন ঠেকাতে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না, তখন শিলখুড়ি গ্রামের চার মাথা এলাকার কালজানি নদীর পাড়ের মানুষজন নিজেরাই উদ্যোগ নেন নদী ভাঙন ঠেকানোর।মনোবল আর শ্রমকে পুঁজি করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইতোমধ্যে কালজানি নদীর পাড়ে ৩ কিঃমিঃ জুড়ে বালু ভর্তি ব্যাগ,বাঁশ কাঠ ফেলে যতটুকু করেছেন সেটাই এখন বিস্ময়।
নদ নদী ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে,জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বন্যা ও উজানের ঢলে নদীর তীর ও পাহাড়ের মাটি ধসে নদীর তল দেশে ভরাট হচ্ছে। নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে একাধিক ডুবো চর। এতে শুধু নদীর নাব্যতা সৃষ্টি হচ্ছে না, পানি প্রবাহের গতি পথেরও পরিবর্তন হচ্ছে।ফলে পানি প্রবাহের রাস্তা বাঁধা গ্রস্থ হয়ে শুধু বন্যা মৌসুমে নয়, সারা বছরই তীর ভাঙছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক আবাদিজমি, ঘর বাড়ি ও স্থাপনাগুলো।এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে না,নিজের ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন এখানকার মানুষজন।
উত্তরণে সহযোগিতার আশায় না থেকে যৌথ উদ্যোগে তিন কিলোমিটার জুড়ে বালু ভর্তি ব্যাগ ফেলানো ও বাঁশ,গাছ ও কাঠ দিয়ে নদীর পানির গতি পরিবর্তনে চেষ্টা করছেন এখানকার স্থানীয়রা।ভাঙনরোধের কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারলে আগামী দুবছর নদী ভাঙনের দুঃশ্চিন্তা থাকবে না বলে জানান স্থানীয়রা।
ভাঙন ঠেকাতে স্বেচ্ছা শ্রমে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবক মোঃ ফিরোজ আলী জানান,নদী ভাঙন ঠেকাতে বহুজনের কাছে গেছি। সবাই কথা দিয়েছেন কিন্তু কাজ করেননি। তাই নিজেরা উদ্যোগ নিয়েছি প্রায় ৩ কিঃমি জুড়ে পানি প্রবাহের গতি পরিবর্তন করা ও কালজানি নদীর গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পয়েন্টে বালু ভর্তি ব্যাগ ফেলানোর।আশা করছি এ উদ্যোগটা কাজে লাগবে।এলাকাটি নদী ভাঙন থেকে অনেকাংশে রক্ষা হবে।
ষাটোর্ধ বাসিন্দা মোঃ জয়নাল মিয়া বলেন,নদী ভাঙন যে কত কষ্টের তা আমরা জানি।চোখের সামনে আমাদের অনেক আত্মীয় স্বজনদের নিঃস্ব হতে দেখেছি। আগুনে পুড়লে অন্তত ভিটে মাটি থাকে কিন্তু নদী ভাঙন সব নিঃস্ব করে দেয়।বিশেষ করে অসময়ে নদী ভাঙন বিরাট ক্ষতির কারন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বেচ্ছা শ্রমে কাজ করা মোঃ আকবর হোসেন বলেন,অসময়ে নদী ভাঙন শুরু হওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি।কারো কোন সহযোগিতা পাই নাই।বাঁধ্য হয়ে বিকল্প চিন্তা মাথায় এলো।আলোচনা করে গত দুদিন ধরে গ্রামে নিজেরাই ১০/২০ টাকা চাঁদা তুলে ব্যাগ কিনে স্বেচ্ছা শ্রমে বালু ভর্তি করে ভাঙন ঠেকানোর কাজ শুরু করি। তাই ভাঙন মোকাবেলায় নিজেরা উদ্যোগ না নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না।গত তিন দিন ধরে কাজ করছি। আশা করছি এক সপ্তাহ কাজ করলে কিছুটা হলেও ভাঙন ঠেকানো যাবো।
কৃষাণী মোছাঃ রোমানা বেগম বলেন,কালজানি নদী আগে বন্যার মৌসুমে ভাঙত।এখন বন্যার সময়ের যেমন ঠিক নাই, তেমনি নদী ভাঙনের ঠিক নাই।গত দুদিনে প্রায় ১৫ টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে।বাকি ঘর বাড়ি আবাদিজমি রক্ষায় বাড়ির গৃহস্তরা সবাই মিলে নদীতে বালু ভর্তি ব্যাগ, বাঁশ কাঠ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ করছে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “কুড়িগ্রামের ১৬টি নদনদীর অধিকাংশের উৎস ভারতে হওয়ায় তাদের পানির প্রবাহ উজানের ওপর নির্ভর করে। উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানি ও পলির কারণে নদীর তলদেশ উঁচু হচ্ছে, ফলে তীর ভেঙে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “গত ১০ বছরে এক লাখেরও বেশি মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও ডুবো চর অপসারণ না করায় ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয়নি। নদীভাঙন ও চরের উন্নয়ন নিয়ে আলাদা ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির কুড়িগ্রাম জেলার আহবায়ক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেন,নদী ভাঙন ঠেকাতে পরিকল্পিত ও স্থায়ী নদী শাসন ব্যবস্থা ছাড়া কোন সমাধানের সুযোগ নেই।নিজেদের অস্থিত্য রক্ষায় স্বেচ্ছা শ্রমে কাজ করার মানুষগুলোর এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।শুধু নদী ভাঙনই নয়,জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট সমস্যা ও উত্তরণে সবাইকে ভেবে চিন্তে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহবান জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন,নদী ভাঙন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজ চলমান আছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

