বগুড়া সদর থানার ভেতরেই গ্যারেজসংলগ্ন একটি কক্ষ দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একটি কম্পিউটার দোকান। সরকারি দপ্তরের ভেতরে এ ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও, কর্তৃপক্ষের নীরবতায় বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ বলছেন, “যেখানে ন্যায়বিচারের খোঁজে যাই, সেখানেই এখন বাণিজ্যের ফাঁদ! থানার ভেতর যদি বাণিজ্য চলে, মানুষ বিচার চাইবে কোথায়?” কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, থানার ভেতরে ঢুকে একদিকে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে জিডি কিংবা অভিযোগ করতে চাইলে মাথার ইশারায় দেখিয়ে দেওয়া হয় বাইরে। কখনো না বুঝে আবার জিজ্ঞাসা করলে ধমক দিয়ে বলা হয়, বাইরে থেকে করে নিন। পরে বাধ্য হয়ে থানা চত্বরের ওই দোকান থেকেই কাজটি করতে হয়। প্রতিটি জিডি বা অভিযোগ লিখে নিতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আবার থানার ভেতরেই করলে ১০০ কিংবা ২০০ টাকায় কাজ হয়ে যায়। কম্পিউটার দোকানের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন বগুড়া সদরের নারুলী এলাকার বাসিন্দা।
জানা গেছে, তিনি পূর্বে থানার পুলিশ সদস্যদের জন্য চা সরবরাহ করতেন। সেই সূত্রেই তাকে থানার ভেতরে দোকান বসানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন দোকানদার। তিনি আরও বলেন, “গত বছরের ৫ আগস্ট নতুন ওসি স্যার এসে আমাকে এই সুযোগ করে দিয়েছেন।” নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, “থানার ভেতরে ব্যবসা পরিচালনা চাকরি জীবনে আগে কখনও দেখিনি। কিন্তু বগুড়ার মতো জায়গায় থানার ভেতরে দোকান একেবারেই বেমানান। আগে এই ছেলেটি থানায় চা সরবরাহ করত, এখন দিয়েছে কম্পিউটারের দোকান। এতে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। থানায় গেলেই তাদের বাইরে পাঠানো হয়। বিষয়টি আমাদেরও খারাপ লাগে, কিন্তু অফিসাররা সহযোগিতা না করলে আর কী করার!”
জেলা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমি একদিন জিডি করতে গিয়েছিলাম। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর আমাকেও বাইরে দোকানে পাঠানো হয়। আমি রাগ প্রকাশ করলে পরে অনুরোধ করে তারা জিডিটি করে দেয়।” জানা যায়, থানার ভেতরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি জিডি বা অভিযোগের টাইপে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। দোকানের আয় কয়েকটি ভাগে ভাগ হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কিছু ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ পান থানার কয়েকজন সদস্য। জাকির হোসেন প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে থানায় এসে প্রথমে অফিসারদের মাঝে চা সরবরাহ করেন, এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দোকান খুলে বসেন। সারাদিন পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য চা সরবরাহের কাজও তিনি চালিয়ে যান।
অভিযোগ আছে, তার মাধ্যমে যে চা সরবরাহ হয়, তার বিল পুলিশকে দিতে হয় না। এ কারণেই তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। থানার অফিসকক্ষের পাশেই দোকানটি স্থাপন করা হয়েছে। জিডি, অভিযোগ বা কাগজপত্র প্রিন্ট করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের পুলিশ সদস্যরাই ওই দোকানে যেতে বলছেন। এতে একদিকে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে থানার ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা বলেন, “জিডি করতে এসে দেখি থানা পুলিশই বলছে দোকান থেকে ফরম টাইপ করে আনতে। এটা একেবারেই অন্যায়।” স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, থানার ভেতরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। তারা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
থানার সামনের এক ফুটপাত ব্যবসায়ী বলেন, “জাহাঙ্গীর হোসেন এমনভাবে চলে, মনে হয় থানায় তার কথাতেই সব হয়। এবং সে বিভিন্ন মামলার তদবির করেও মোটা অংকের টাকা নেয়।
বিষয়টি জানতে চাইলে বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, “আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব। থানার ভেতরে কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম অনুমোদিত নয়। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এ বিষয়ে বগুড়া সদর থানার ওসি সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের অবগত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি; বরং তারা বারবারই বলছেন, বিষয়টি তাদের নজরে পড়েনি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, এটি কেবল জনসাধারণকে হয়রানি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণের একটি নগ্ন উদাহরণ। তারা অবিলম্বে মন্ত্রণালয় ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
পড়ুন: মহেশপুরে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষে আহত ৬
দেখুন: ১ হাজার টাকায় সুনামগঞ্জ ঘোরাঘুরি । সোলেমান হাজারী
ইম/


