নরসিংদীতে ভূমিকম্পে অন্তত শতাধিক নারী-পুরুষ আহত এবং শিশু–সহ ৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোসেন।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার ৮টা পর্যন্ত স্বজনদের বরাতে নিহতের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ওমর ফারুক (৮), নরসিংদী সদরের গাবতলী এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে; কাজম আলী (৭৫), পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, তিনি ভূমিকম্পের সময় মাটির ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান; নাসির উদ্দীন (৬৫), ডাঙ্গা ইউনিয়নের কাজীরচর গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে, তিনি ভূমিকম্পের পর ধানক্ষেত থেকে দৌড়ে বাড়ির পথে গর্তে পড়ে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন; ফোরকান (৩৫), শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামের বাসিন্দা, তিনি ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে মারা যান।
এছাড়া সন্ধ্যারপর ওমর ফারুকের বাবা দেলোয়ার হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ চিকিৎসা থাকাবস্থায় মারা গেছে বলে জানান জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে অনুভূত এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকা। হঠাৎ কম্পন অনুভূত হওয়ার পর জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পনে বিভিন্ন ভবনের দেয়াল এবং মাটিতে ফাটল ধরাসহ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনায় মাধবদীতে হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও নরসিংদী সদর, পলাশ, ঘোড়াশাল, শিবপুর উপজেলা ও রায়পুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ আমিরুল হক। তিনি জানান, নরসিংদী সদর হাসপাতালে ৪৭ জন, জেলা হাসপাতালে ১২ জন এবং রায়পুরায় ২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যান্য উপজেলার আহতরাও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন।
এদিকে নরসিংদী সদর উপজেলার গাবতলী এলাকায় একটি ভবনের ছাদ ধসে নারী ও শিশুসহ তিনজন আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
আহতদের মধ্যে পরিচয় পাওয়া গেছে—বাড়ির মালিক দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ওমর ফারুক এবং মেয়ে তাসফিয়া। তাদের নির্মাণাধীন ছয়তলা ভবনের দেয়াল ধসে পাশের একতলা ভবনের ওপর পড়ে তারা আহত হন। পরে ওমর ফারুক ও তার বাবা দেলোয়া হোসেন মারা যান। এছাড়া বানিয়াছলে ওম্মে সালমা নামে এক শিশুও আহত হয়েছে।
এদিকে পলাশের ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভূমিকম্পের সময় জাতীয় গ্রিডের সাবস্টেশনের একটি যন্ত্রাংশে আগুন লাগে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পলাশ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আব্দুল শহিদ জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. এনামুল হক জানান, ভূমিকম্পের আঘাতেই সাবস্টেশনে আগুন লাগে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম পিপিএম জানান, নরসিংদী জেলা পুলিশের সব ইউনিট দুর্যোগের মুহূর্তে দ্রুত সহায়তা, চিকিৎসা সেবা, রক্তদান ও সুরক্ষায় কাজ করছে। তিনি ভূমিকম্পে আহতদের খোঁজখবর নিতে তাদের বাড়িতেও যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসেন পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে জানানো হয়েছে, এর মাঝে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনে অগ্নিকাণ্ডের সূচনা হলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে প্রেরণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও অত্র সাবস্টেশনের বিপুল পরিমাণ পিটি(প্রডাকশন ট্রান্সফরমার) ভূ-কম্পনের ফলে ভেঙে পড়ে।
ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানার ইউরিয়া প্রডাকশন ভূমিকম্পন জনিত কারণে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। ভূ-কম্পনের সময় ইঞ্জিন মেশিনারিজ ভাইব্রেশনের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায় এবং মেশিনারিজ চেকিং অপারেশনে আছে বলে জানান জেলা প্রশাসন।
এছাড়া, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউসহ শতাধিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্প সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ও দূর্যোগ সংশ্লিষ্ট তথ্যের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে কন্ট্রোল রুম খুলে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোজ খবর রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

