আলোচনায় থাকার জন্য কাশ্মীরের উপাদান রয়েছে অনেক।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সিল্ক রুটের জন্য বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলের নাম পৃথিবীর সবখানে ছড়িয়ে পড়লেও শুধু এগুলো নয় এর রয়েছে স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ সংস্কৃতি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় লোকজশিল্প কিংবা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ছাড়াও আরেকটি বিষয় পর্যটকদের আকর্ষণের মূলে পরিণত হয়েছে– ওয়াজওয়ান। এটি একটি মাল্টি কোর্স খাবারের নাম।
কাশ্মীরী ভাষায় ‘ওয়াজওয়ান’ শব্দটির নিজস্ব অর্থ রয়েছে। ‘ওয়াজা’ বলতে বোঝানো হয় বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন রাঁধুনি। আর ‘ওয়ান’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘দোকান’। অনেকে বলেন, ‘ওয়ান’ বলতে আসলে ‘দোকান’ বোঝানো হয় না, বরং সেই স্থানকে বোঝানো হয় যেখানে এই খাবার প্রস্তুত করা হয়। ওয়াজওয়ান বলতে সেই খাবারকে বোঝানো হয়, যে খাবারটি বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন রাঁধুনির তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয় এবং বিশেষ জায়গায় পাওয়া যায়।
এটি সাধারণত কোনো উপলক্ষে রান্না করা হয়। সাধারণত কোনো উৎসব, বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা পার্টি থাকলে এই খাবার বিশেষভাবে রান্না করা হয়। এছাড়া অনেক সময় বাইরের দেশ থেকে রাজনীতিবিদরা আসলে এই খাবার পরিবেশন করা হয়।
ওয়াজওয়ান তৈরির প্রধান উপকরণ হচ্ছে সদ্য জবাই করা ভেড়া কিংবা খাসির মাংস। বলা হয়, ওয়াজওয়ানের দুর্দান্ত স্বাদের পেছনে মূল কারণ হচ্ছে- এটি রান্নার ক্ষেত্রে একেবারে টাটকা মাংস ব্যবহার করা হয়। প্রাণীর দেহের একেক অংশের মাংস একেক পদের খাবার রান্নার জন্য আলাদা করে রাখা হয়। যেমন- পাঁজরের অংশ দিয়ে রান্না করা হয় ‘তাবাক মাজ ’,পায়ের অংশবিশেষ দিয়ে রান্না করা হয় ‘দানি ফুল’, ভুড়ির অংশগুলো রাখা হয় ‘মেথি মাজ’ রান্নার জন্য, ঘাড়ের অংশ দিয়ে রান্না করা হয় ‘রোগান জোশ’ এবং একেবারে সাধারণ মাংস ব্যবহার করা হয় রিশতা, গুস্তাভা নামক মাংসের বল বা কোফতা এবং শিক কাবাব বানানোর জন্য।মুরগী দিয়ে বানানো হয় ওয়াজা কোকুর ,মার্চওয়াংগান কোরমা ও জাফরান চিকেন।ভেজ আইটেমের মধ্যে থাকে ‘ওয়াজা পালং শাক বা যে কোনো সবুজ পাতার ‘হাখ’, পনির দিয়ে টমেটোর গ্রেভি ‘রুয়াংগান চামান’, দম আলু, ‘নাদ্রু ইয়াখনি’ বা কমল কন্দের সাথে টক দইয়ের গ্রেভি, কাশ্মীরি রাজমা।চাটনির মধ্যে ‘দুন চেটিন’ বা দই দিয়ে আখরোট পিষে বানানো চাটনি ,‘ঘান্ড চেটিন’ বা পেয়াজ-মরিচ দিয়ে বানানো চাটনি।মুলা,মিষ্টিকুমড়া ও কালো বেরির চাটনিও থাকতে পারে এতে। এছাড়া একেক পদের খাবারের জন্য আলাদা আলাদা মশলা ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসব মশলার কারণে একেক খাবার একেক বর্ণ ও স্বাদের হয়ে থাকে।
এসব কিছু পরিবেশন করা হয় “ত্রামি” নামক এক বড় পাত্রে যেখানে ৪ জন একসাথে খেতে পারে ।ঐতিহ্যগতভাবে ওয়াজওয়ান খাওয়া হয় কার্পেটের উপর বসে, এবং শুধু হাত ব্যবহার করেই। সাধারণত অতিথিরা কার্পেটের উপর বসে গেলে ‘তাশত তি নায়ের’ নামের একটি বাসনে হালকা গরম পানিতে তাদের হাত ধুয়ে নেয়া হয়। খাওয়ার আগে সবাই দলগত ভাবে প্রার্থনাও করে থাকে।
ওয়াজওয়ান বানাতে দুই দিন সময় লাগে ।এটি ১৪ থেকে ৩৬ বা এর বেশি পদবিশিষ্ট ও হতে পারে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। কাশ্মীরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে ধারণ করার ক্ষেত্রে এর চেয়ে ভালো কোনো খাবার আর নেই।
পড়ুন-শীতে মিষ্টি মিষ্টি দুধ পুলি
দেখুন- খেজুরের গুড়ের গোলাপ পিঠা |


