নাট্যদল বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনায় সম্প্রতি মঞ্চে এসেছে দস্তয়ভস্কির বিখ্যাত ছোটগল্প দ্য জেন্টেল স্পিরিট অবলম্বনে নাটক ‘ভাসানে উজান’। অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর নাট্যরূপ এবং শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের নির্দেশনায় একক নাটকে অভিনয় করেছেন মো. এরশাদ হাসান। গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘ভাসানে উজান’ নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয়। দর্শকদের চাহিদায় ‘ভাসানে উজান’ নাটকটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী গত শনিবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয়। ‘ভাসানে উজান’ নাটকের অভিজ্ঞতা নিয়ে নাগরিক টিভির অনলাইনের সাথে একান্তে কথা বলেছেন মো: এরশাদ হাসান।
নাগরিক : ‘ভাসানে উজান’-এ আপনি যেন এক মানুষের আত্মার ভেতরকার নদীতে নেমে পড়েছেন। আপনার কাছে এই চরিত্রটি- এক মঞ্চসত্তা, নাকি এক আত্মস্মৃতি? কোন জায়গা থেকে তার সঙ্গে আপনার গভীরতম সংযোগটি তৈরি হলো?
এরশাদ হাসান : এই চরিত্রটি আমার কাছে নিছক অভিনয় নয়, এক ধরণের আত্মদর্শন। মানুষের ভেতরে যে লুকানো একাকিত্ব থাকে, যে অপরাধবোধ, যে আকাঙ্ক্ষা- তা আমি নিজের জীবনেও অনুভব করেছি। চরিত্রের প্রতিটি নীরবতা আমার নিজের কোনো না কোনো ক্ষীণ স্মৃতিকে নাড়া দিয়েছে। তাই অভিনয়ের মুহূর্তে মনে হয়েছে, আমি চরিত্রকে ধারণ করছি না, বরং চরিত্র আমাকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।

নাগরিক : একটি একক নাটকে অভিনেতা শুধু চরিত্রই হন না- হন দৃশ্য, হন নীরবতা, হন সুরের অদৃশ্য প্রতিধ্বনি। অভিনয় করতে গিয়ে কোন মুহূর্তে আপনি অনুভব করেছিলেন- আপনি আর চরিত্র দুটি আলাদা নন?
এরশাদ হাসান : রিহার্সালের এক রাতে, মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পরও আমি চরিত্রের ব্যথা অনুভব করছিলাম। তার শ্বাসপ্রশ্বাস যেন আমার বুকের ভেতরেই চলছিল। তখনই বুঝেছিলাম- সীমারেখাগুলো মুছে গেছে। একক নাটকের সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো এই নিঃশব্দ মগ্নতা- যেখানে অভিনেতা আর চরিত্র একই স্রোতের দুই দিক হয়ে ওঠে।
নাগরিক : দস্তয়েভস্কির গল্পের অন্ধকার, ভালোবাসা, অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানি- এসবের সঙ্গে মঞ্চের আলোক, ছায়া ও নীরবতার যে মিলন ঘটেছে, তা কীভাবে আপনার অভিনয়শৈলীতে নতুন কোনো ভঙ্গিমা তৈরি করল?
এরশাদ হাসান : দস্তয়েভস্কি মানবমনের গভীরতম অন্ধকারকে খুব সূক্ষ্মভাবে দেখান। সেই অন্ধকারকে মঞ্চে আলোক ও ছায়ার সাহায্যে রূপ দিতে গিয়ে আমাকে এক নতুন ভাষা খুঁজে নিতে হয়েছে- যেখানে দেহভঙ্গি, নীরবতা এবং ভেতরের টানাপোড়েন সমান গুরুত্ব পায়। অভিনয়ের বাহ্যিক শক্তি নয়, অভ্যন্তরের কম্পনই হয়ে উঠেছে মূল শক্তি।
নাগরিক : এ নাটকে আপনার দেহ, দৃষ্টি, শ্বাস- সবই অর্থ বহন করে। আপনি কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন এমন এক অভিনয়ের জন্য, যেখানে একটি ক্ষুদ্র নীরবতাও সুনির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে?
এরশাদ হাসান: প্রস্তুতির জন্য আমাকে নিজের শরীরকে ‘শব্দ’ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হয়েছে। দিনের পর দিন শুধু শ্বাসের তালে কাজ করেছি- কোন শ্বাস কোন অনুভূতিকে জাগায়, কোন দৃষ্টির কোণে যন্ত্রণার ছায়া থাকে। নীরবতা আমার কাছে কেবল বিরতি নয়; এটি চরিত্রের অভ্যন্তরের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদটিই নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে চেয়েছি।
নাগরিক : একক অভিনয়ের মঞ্চে দাঁড়ান মানে নিজের ভয়, দুর্বলতা, ক্লান্তি- সবকিছুর সঙ্গে একা লড়াই করা। ‘ভাসানে উজান’ কি আপনাকে আপনার কোনো অচেনা সীমা বা নতুন শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে?
এরশাদ হাসান: হ্যাঁ, এই নাটক আমাকে নিজের ভয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একাকিত্বের ভেতর নিজের কণ্ঠ শুনতে পাওয়া কঠিন, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়েই আমি আমার নতুন শক্তি খুঁজে পেয়েছি- দীর্ঘ নীরবতা বহন করার শক্তি, নিজের শরীরকে ভাষায় রূপান্তর করার শক্তি। এ যেন আমার শিল্পভ্রমণের নতুন দরজা।

নাগরিক : দলীয় নাটকের উষ্ণ সমবেততা থেকে হঠাৎ একা আলোয় দাঁড়ানো- এই রূপান্তরের মুহূর্তগুলো কীভাবে আপনাকে বদলে দিয়েছে? আপনি কি মনে করেন, একক নাটকের অভিজ্ঞতা একজন অভিনেতাকে গভীরতর করে তোলে?
এরশাদ হাসান: দলীয় নাটকে সহশিল্পীরা আপনার কাঁধে হাত রাখেন, শক্তি দেন। কিন্তু একক নাটকে পুরো পৃথিবী আপনাকেই বহন করতে হয়। এই দায়িত্ববোধ আমাকে আরও সজাগ করেছে, আরও আত্মমগ্ন করেছে। আমি মনে করি- একক অভিনয় অভিনেতাকে শুধু পরিণতই করে না, তাকে নিজের শিল্পসত্তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
নাগরিক : ‘ভাসানে উজান’ কি আপনাকে আপনার ভবিষ্যৎ নাট্যযাত্রা সম্পর্কে নতুন কোনো দরজা খুলে দিয়েছে? একক নাটককে আপনি বাংলাদেশের সমকালীন মঞ্চধারায় কী ধরনের সম্ভাবনার আলোয় দেখছেন?
এরশাদ হাসান: এই নাটক আমার অভিনয়-ভ্রমণের মানে নতুনভাবে বুঝিয়েছে। এখন আমার মনে হয়- একক নাটক বাংলাদেশের মঞ্চে এক নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। আমাদের সমাজে একাকিত্ব, দ্বন্দ্ব, হতাশা- এসব আজ খুব বাস্তব। একক নাটক এসব অনুভবকে সরাসরি মঞ্চে তুলে ধরার এক অনন্য ভাষা। ‘ভাসানে উজান’ সেই ভাষার এক সূচনা মাত্র।


