বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীলতা কমাতে খাল-বিল, পুকুর-দিঘিসহ ভূ-উপরিভাগে জলাধারসমূহে সারা বছর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া এই অঞ্চলের চাষাবাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।
রোববার (৩০ নভেম্বর) দুপুরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় একশনএইড বাংলাদেশের- সুশীল প্রকল্প ও নওগাঁর স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিডিও (বরেন্দ্র উন্নয়ন সংস্থা) আয়োজিত ‘বরেন্দ্র এলাকা পানি দুর্যোগের শিকার ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিডিওর সভাপতি সাদেকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সংস্থাটির নওগাঁ কার্যালয়ে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নওগাঁ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নূর মোহাম্মদ, সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক রুস্তম আলী আহমেদ, সুশীল প্রকল্পের নওগাঁ জেলা সিএসও ( নাগরিক সমাজ সংগঠন) অ্যালায়েন্স হাবের সভাপতি ফজলুল হক খান, বিডিওর নির্বাহী পরিচালক আখতার হোসেন, নওগাঁ থেকে প্রকাশিত দৈনিক বরেন্দ্রকণ্ঠের সম্পাদক বেলায়েত হোসেন, পরিবেশবিদ সামসুল হক, জাহিদ রাব্বানী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
কর্মশালার শুরুতেই বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ নেমে যাওয়া ও এর প্রভাব নিয়ে বিডিও পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন বিডিওর নির্বাহী পরিচালক আখতার হোসেন। নওগাঁর নিয়ামতপুর ও সাপাহার উপজেলার ২০টি গভীর নলকূপের পানির স্তর পরীক্ষা করে বিডিও দেখিয়েছে, উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের দুইটি পয়েন্টে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমেছে ১১ মিটার। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২মিটার করে পানির স্তর নামলেও পানি রিচার্জের হার দশমিক শূন্য ৫ মিটার করে। নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের একটি পয়েন্টে ২০১৭ সালে ভূগর্ভস্ত পানি প্রাপ্তির স্তর ছিল ৯৪ মিটার। ২০২৪ সালে সেখানে ভূগর্ভস্ত পানি প্রাপ্তির স্তর দাঁড়ায় ১০৪ মিটার। একই ইউনিয়নের আরেকটি পয়েন্টে ৭ বছর আগে ভূগর্ভস্ত পানির স্তর ছিল ৯৫ মিটার। ৭ বছর পর সেখানে ভূগর্ভস্ত পানির স্তর দাঁড়িয়েছে ১০৬ মিটার। নিয়ামপুর উপজেলার মুন্দিখৈর গ্রামের একটি পয়েন্টে ১৩৫ ফিট (৪১) মিটার গভীরে ভূ-গর্ভস্ত পানির স্তর নেমে গেছে। এর নিচে আর পানি নেই।
গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতিতে প্রতিবেদনটিত নওগাঁয় পানির স্তর নেমে যাওয়ার প্রবণতাকে বিপজ্জনক হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এ হারে কমতে থাকলে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে নওগাঁর উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলার অনেক এলাকায় সুপেয় পানি পাওয়া যাবে না। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়বে। এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীলতা কমাতে খাল-বিল, পুকুর-দিঘিসহ ভূ-উপরিভাগে জলাধারসমূহে সারা বছর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ সুশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর, সাপাহার ও নওগাঁ সদর উপজেলায় স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা বিডিও। এই প্রকল্পের মূল কাজ হলো মানবাধিকার, জাতীয় সংহতি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সুশীল সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করা।
বিডিওর নির্বাহী পরিচালক আখতার হোসেন বলেন, নওগাঁ তথা বরেন্দ্র অঞ্চলে যেভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর কমছে তাতে করে অচীরেই সুপেয় পানির চরম সংকট দেখাম দেবে। এই অঞ্চলে সেচ নির্ভর আবাদ বেশি হওয়ার কারণে বোরো মৌসুমে (মার্চ থেকে মে মাস) পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়। অথচ এই সময়ে পানির প্রবাহ সবচেয়ে কম থাকে। আবার যখন পানির চাহিদা কম থেকে তখন পানির প্রবাহ বেশি থাকে। বাংলাদেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২০০০ মিলিমিটার। সেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪০০ মিটার, যা সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। এজন্য এ অঞ্চল খরাপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এজন্য ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির আধার বৃদ্ধির জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
পরিবেশবিদ শামসুল আলম বলেন, বাংলাদেশে মরূকরণ প্রবণতা ঠেকাতে পানির পুনব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানির অপচয় যেন না হয় সেই ব্যাপারে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। পুকুর, নদী-নালা খনন করে ভূ-উপরিভাগে পানির ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো প্রযুুক্তিকে জনপ্রিয় করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নূর মোহাম্মদ বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করতে হবে। উন্নত বিশ্বে যেভাবে সুপেয় পানির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় সেভাবে বাংলাদেশেও আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
নওগাঁতে সরকারি উদ্যোগে প্রায় ৫ হাজার গভীর নলকূপ এবং বেসরকারিভাবে আরও প্রায় ৩০ হাজার গভীর-অগভীর নলকূপ বসানো হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক রুস্তম আলী আহমেদ বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ করে নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার ও পত্মীতলায় সার্ফেস ওয়াটার (ভূ-উপরিস্থ) পানির উৎস খুবই কম। এ জন্য এসব এলাকায় কৃষিজমিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ অবস্থায় এ অঞ্চলে চাষাবাদে পরিবর্তন আনতে হবে। ধানের পরিবর্তে গম, ভুট্টা, শর্ষে ও তুলাজাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়াতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীলতা কমাতে খাল-বিল, পুকুর-দিঘিসহ ভূ-উপরিভাগের জলাধারগুলোতে সারা বছর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
পড়ুন- আইনশৃঙ্খলা, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সঃ চাঁদপুরের এস পি


