ঢাকার ধামরাইয়ে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে একাধিক প্রশ্ন ও স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথমে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, পরে নিহতের পরিবারের অভিযোগ দেবরের সাথে প্রেমের সম্পর্ক, শিশুসন্তানের বক্তব্যে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নিহত নারীর দেবর, যিনি পেশায় একজন পুলিশ সদস্য।
ভুক্তভোগী স্বামী জাকির হোসেন আদালতে অভিযোগ করার পরও তদন্তে পুলিশের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নিহত ওই গৃহবধূর নাম রূপা আক্তার (২৫)। তিনি ধামরাই উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের আমরাইল রামভদ্রপাড়া এলাকার মো. জাকির হোসেনের স্ত্রী। ঘটনাটি ঘটে উপজেলার বাইশাকান্দা ইউনিয়নের বাগাইর গ্রামের মৃত নুরুল ইসলাম নান্নুর মালিকানাধীন একটি টিনশেড ঘরে। সেখানে জাকির ও রূপা দম্পতি ভাড়া থাকতেন। গত ২৮ নভেম্বর রাতে কারখানা থেকে ভাড়া বাসায় ফিরে এসে স্বামী জাকির হোসেন স্ত্রী রূপাকে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন।
অভিযুক্ত শাওন হাসান উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের আমরাইল রামভদ্রপাড়া এলাকার কামাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি পুলিশের চাকরি করেন। শাওন নিজেও বিবাহিত, তবে পুলিশের চাকরি করায় বিয়ের নির্দিষ্ট সময় না হওয়ায় নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে বাড়িতে উঠিয়ে আনতে পারছেন না।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় প্রতিবেশী ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালে রূপা আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় জাকির হোসেনের। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই জাকিরের চাচাতো ভাই, পুলিশ সদস্য শাওন হাসানের সঙ্গে রূপার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরে ওই সম্পর্ক একপর্যায়ে প্রেম ও অনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেয়।
রূপা ও শাওনের হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথনের স্ক্রিনশট এবং শাওন রূপার ছবি দিয়ে বানানো টিকটক দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুজনের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। স্বামী জাকির হোসেনের অনুপস্থিতিতে রাতে শাওনকে ঘরে ডেকে নিতেন রূপা। একদিন এমন দৃশ্য দেখে ফেলেন রূপার শ্বশুর জামাল উদ্দিন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে একাধিকবার পারিবারিক ও স্থানীয়ভাবে বিচার-সালিশ হয়। এমনকি শাওনকে প্রকাশ্যে মারধর ও সতর্কও করা হয়। নিজের স্ত্রীকে বাড়িতে উঠিয়ে আনতে বলা হয় বিচারের মধ্যে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব সতর্কতা ও বিচার কোনো কাজেই আসেনি। শাওন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রূপাকে ছাড়া সে বাঁচবে না।
ভুক্তভোগী জাকির হোসেন তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে, প্রায় ছয় মাস পূর্বে সংসার রক্ষা ও সামাজিক সম্মান বজায় রাখতে স্ত্রী ও চার বছরের কন্যাসন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে বাইশাকান্দা ইউনিয়নের বাগাইর এলাকায় রূপার বড় বোনের বাড়ির পাশে মৃত নুরুল ইসলাম নান্নুর মালিকানাধীন একটি টিনশেড ঘরে ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে নতুন করে বসবাস শুরু করেন তারা। জাকির হোসেন স্থানীয় প্রতীক সিরামিকস কারখানায় কাজ করতেন। বাসায় রূপা আর তার চার বছরের মেয়ে জিমহাকে নিয়ে একাই থাকতেন।
স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য, ঠিকানা বদলালেও শাওন হাসান রূপার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেননি। বরং নতুন ঠিকানা জোগাড় করে বাসা ফাঁকা থাকার সময়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন শাওন। বিষয়টি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই কলহ লেগেই থাকত।
গত ২৭ নভেম্বর রাতে জাকির হোসেন তার কর্মস্থলে থাকায় বাসায় একা থাকেন রূপা। সঙ্গে ছিল শুধু তার চার বছরের মেয়ে। এই সুযোগে শাওন হাসান ওই ভাড়া বাসায় রূপার কাছে যান। তিনি রূপাকে সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। প্রতিবেশীরা বিষয়টি টের পেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শাওন সেখান থেকে দ্রুত চলে যান। ঘটনার পর রূপা প্রতিবেশীদের অনুরোধ করেন, বিষয়টি যেন কাউকে জানানো না হয়, বিশেষ করে তার স্বামীকে।
প্রত্যক্ষদর্শী মধ্যবয়সী এক নারী প্রতিবেশী বলেন, “ওই দিন রাতে আমি দেখি রূপাকে ধরে টানাটানি করছে একটা ছেলে তার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এটা দেখে আমি রূপাকে ধমক দিই—এই রূপা, কী করছ এইগুলো? এত রাতে এই ছেলে কেন তোর রুমে? রূপা তখন আমাকে বলে, ফুপু, ওর নাম শাওন, আমার দেবর লাগে সম্পর্কে। তখন আমি বলি, দেবর লাগে তো কী? এত রাতে এসে এরকম টানাটানি, জড়াজড়ি করে কেউ? ওরে দ্রুত তাড়া না করলে আমি মানুষ ডাকব। তখন ওই ছেলে (শাওন) তড়িঘড়ি করে চলে যায় এবং রূপা আমাকে অনুরোধ করে বলে, ফুপু, এই ঘটনা তুমি কাউকে বোলো না। আমি বলি, ঠিক আছে, বলব না, কিন্তু ওই পোলাকে যেন আর কখনো এখানে না দেখি।”
এর ঠিক পরদিন ২৮ নভেম্বর রাতে জাকির হোসেন প্রতিদিনের মতো তার কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ঘরের ভেতর রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর প্রথমদিকে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হয় এবং রূপার মরদেহ দাফন করা হয়। এর দুই দিন পর নিহত রূপার চার বছরের কন্যাসন্তান জিমহার বক্তব্যে ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়।
দুই দিন পর শিশু জিমহা জানায়, “শাওন এসে তার মাকে গলা টিপে ও রশি দিয়ে মেরে ফেলেছে।” শিশুটি কান্না করলে তাকে ধমক দেওয়া হয় বলেও জানায় সে। যদিও শিশু সাক্ষ্যের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও এমন বক্তব্য তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিশু জিমহার সঙ্গে কথা বললে জিমহা বলে, “শাওন আসছিল। শাওন মার গলা টিপে ধরছে আর রশি দিয়ে মেরে ফেলছে মাকে। আমি কান্না করছি, আমাকে ধমক দিছে, বলছে ঘুমা। পরে আমি শাওনের পায়ে কামড় দিছি।”
এরপর নিহতের স্বামী জাকির হোসেন ধামরাই থানায় একাধিকবার গেলেও হত্যা মামলা হিসেবে অভিযোগ নিতে গড়িমসি করা হয়। পরে কেবল একটি সাধারণ অভিযোগ নেওয়া হলেও পূর্বেই মরদেহ দাফন করে দেওয়ার ফলে কার্যকর তদন্ত হয়নি। পরে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের আশায় বাধ্য হয়ে তিনি ধামরাইয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে একটি হত্যা মামলার আবেদন করেন। আদালত তদন্ত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিলেও পুলিশ সে অনুযায়ী কাজ করেনি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী জাকির হোসেন।
এ বিষয়ে নিহত রূপার স্বামী জাকির হোসেন বলেন, “আমাদের বিয়ের কয়েক দিন পর থেকেই আমার স্ত্রী রূপার সঙ্গে আমার চাচাতো ভাই শাওনের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এ নিয়ে আমার বাড়িতে একাধিকবার বিচার করা হয়েছে। শাওনকে তার পরিবার ও মাতব্বররা চাপ দেয় নিজের স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে আসতে বলে। কিন্তু শাওন তা না করে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আরও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পরে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতে স্ত্রী ও চার বছরের মেয়েকে নিয়ে বাইশাকান্দা ইউনিয়নের বাগাইর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতে থাকি। এখানেও শাওন চলে আসে। একাধিকবার গোপনে আমার বাসায় আসে। আমার স্ত্রী রূপাকে নিয়ে পালাতে চাইলে সে রাজি না হওয়ায় তাকে গলা টিপে মেরে রশি দিয়ে ঘরের ভেতর ঝুলিয়ে রেখে চলে যায়।”
জাকির আরও বলেন, “এ ব্যাপারে থানায় ঘুরেও লাভ হয়নি। নামে মাত্র একটি অভিযোগ নিয়েছে। পরে আমি কোর্টে মামলা করি। কোর্ট ১০ দিনের মধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট দিতে বললেও থানা পুলিশ এ নিয়ে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। হয়তো শাওন পুলিশ সদস্য বলে মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে এখানকার পুলিশ। ওই শাওনই আমার সংসার নষ্ট করেছে। আমার জীবনটা ধ্বংস করে ফেলেছে। আমার একটা চার বছরের মেয়ে আছে। মা ছাড়া আমি আমার মেয়েকে কীভাবে মানুষ করব? আমি সরকার ও প্রশাসনের কাছে হাত জোড় করে অনুরোধ করতে চাই—এই ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করলেই আসল ঘটনা বের হয়ে আসবে। শাওন আর আমার স্ত্রীর সম্পর্কটা প্রায় সবাই জানত। কয়েকবার বিচার হয়েছে এলাকায়। হত্যার আগের দিন রাতে এখানে শাওন এসেছিল, প্রতিবেশীরা দেখেছে। হত্যার ঘটনা আমার নিষ্পাপ মেয়ে দেখেছে। এরপরও কীভাবে পুলিশ এই ঘটনা অবহেলা করছে? শাওন পুলিশ বলেই কি পুলিশরা এটা এড়িয়ে যাচ্ছে?”
নিহতের বড় বোন সুবর্ণা আক্তার বলেন, “আমার বোন জামাই সংসার টিকিয়ে রাখতে নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় ভাড়া বাসায় উঠল। তারপরও শাওন আমার বোনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে আসত। আমার বোন শাওনের সঙ্গে যেতে না চাওয়ায় হত্যা করে রেখে গেছে। আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য বলেই কি তার বিচার হবে না? আমরা গরিব বলে কি ন্যায়বিচার পাব না? আইন তো সবার জন্যই সমান শুনছি। তাহলে শাওন যে আমার বোনকে এভাবে হত্যা করল, তার কোনো ব্যবস্থা কেন পুলিশ নিচ্ছে না?”
নিহতের বোনজামাই আলমগীর হোসেন বলেন, “একটি শিশুর সামনে তার মাকে হত্যা করা হয়েছে। শিশু তো আর মিথ্যা বলবে না। এই শিশুর কথা থেকেই পুলিশ তদন্ত করে দেখুক আসল ঘটনা কী। কিন্তু পুলিশ তো কোনো কিছুই করছে না। তদন্ত নেই, বিচার নেই—এটা আমাদের সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা।”
অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য শাওন হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসবের কিছুই জানেন না বলে জানান। পরে তাকে প্রশ্ন করা হয়—আপনাদের প্রেমের কথা আপনার এলাকার সবাই জানে, কয়েকবার বিচারও হয়েছে। রূপার নতুন বাসায়ও রাতে এসেছেন, যা প্রতিবেশীরা দেখেছে। এছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপে আপনাদের দুজনের কথার স্ক্রিনশট আছে। আপনার টিকটক আইডিতে রূপার ছবি দিয়ে টিকটক বানিয়ে ছাড়ছেন। আপনি কিছুই জানেন না—এটা কী করে সম্ভব? তখন শাওন আবার বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং রাখি বলে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, “গত ২৮ তারিখে রূপার মৃতদেহ তার যে ভাড়া বাসায় ছিল, সেখানে তার স্বামী দাবি করেছেন যে তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতে রূপার স্বামী একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত আমাদের কাছে একটি প্রতিবেদন চেয়েছিলেন—এই ঘটনায় ধামরাই থানায় কোনো জিডি বা অপমৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে কি না। যেহেতু বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন, সেহেতু আমাদের কাছে যে তথ্য ছিল, তা আমাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আদালতে জানিয়েছি।” তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
একজন গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক, ঘটনার আগের রাতে প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী ও শিশুর ভয়াবহ বক্তব্য এবং অভিযুক্তের পরিচয়—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন আর শুধু পারিবারিক বিষয় নয়; এটি আইন, সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সব মিলিয়ে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হয় কি না এবং নিহতের পরিবার আদৌ ন্যায়বিচার পায় কি না।
পড়ুন- জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু
দেখুন- তারেক রহমানের ফেরার খবরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে পতিত শক্তি?


