বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
১৯৪৫ সালে ভারতের জলপাইগুড়িতে—তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায়—জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তার পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামে।
১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। কলেজে অধ্যয়নকালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। পরবর্তীতে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিতে না পারায় রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্বশিক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে পাকিস্তানি সেনারা বন্দি করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ২ জুলাই থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বন্দিজীবন কাটান। স্বাধীনতার পর সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। সরাসরি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আপসহীন অবস্থান ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে তিনি দ্রুতই ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৮৩ সালে সাতদলীয় জোট গঠন করে তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটি আসনেই বিজয়ী হয়ে একটি অনন্য রাজনৈতিক রেকর্ড স্থাপন করেন।
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মামলায় কারাবাস ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়। ২০১৮ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি আবার কারাগারে যান। পরে নির্বাহী আদেশে জামিনে মুক্তি পান।
প্রায় চার দশকের বেশি সময় বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তার মৃত্যুতে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
পড়ুন: আপসহীন এক নেত্রী: বেগম খালেদা জিয়া
আর/


