মামলা বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে সম্প্রতি গ্রেফতার করে পুলিশ। টানা ১১ দিন ধরে কারাগারে রয়েছেন তিনি। এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক কর্মসূচিতে জানায়, জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। এই প্রশ্নে একচুলও ছাড় দেবে না তারা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম দাবি করেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনার তাহরিমা জামান সুরভীকে ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। রবিবার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এই তথ্য জানিয়ে বলেন, বিষয়টি মূলত সুরভীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা ও অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার জেরেই ঘটেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশা বলেন, এই সাংবাদিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ছবি দেখিয়ে বলে তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ঘনিষ্টজন। এই ধরণের প্রেসার ক্রিয়েট করে দেশে মামলা বাণিজ্য হয় আর সেই মামলা বাণিজ্যে আমাদের জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা সুরভীকে ফাঁসানো হয়।
সিনথিয়া আরও বলেন, কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাহরিমা সুরভীকে ৫০ কোটি চাদাবাজির মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সুরভীকে অবৈধ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং সে মিডিয়া ট্রায়ালের শিকারও হয়েছে।
মঈনুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন, মামলার বাদি সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখিয়ে সুরভীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পরে কুপ্রস্তাব দেওয়ার পর সুরভী তা প্রত্যাখ্যান করলে বিষয়টি প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানান। এর জের ধরে সাংবাদিক নাঈমুর সংঘবদ্ধভাবে মিডিয়া ট্রায়াল চালিয়ে সুরভীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির ভুয়া সংবাদ তৈরি করেন, যা মামলাতেও উল্লেখ নেই।
তিনি আরও বলেন, সুরভী গণহত্যাকারী লীগের বিরুদ্ধে ভোকাল থাকার কারণে যাচাই-বাছাই ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঈনুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা সুরভীর পাশে আছে এবং অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছেন। এছাড়া জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় মানবেন না বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, মামলা বাণিজ্য ও প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গাজীপুরে তাহরিমা জান্নাত সুরভী (২১) নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথবাহিনী। তাকে গ্রেপ্তারের পর এবার ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।
এক ফেসবুক পোস্টে তাহরিমার ছবি পোস্ট করে সালাউদ্দিন আম্মার লিখেছেন ‘এই মেয়েটার নাম তাহরিমা, এখন জেলে আছে। অভিযোগ ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি। সংখ্যাটা শুনেই সন্দেহ জাগে। ৫০ কোটি! এই দেশেই যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয় কাগজে-কলমে, সেখানে একজন জুলাইয়ের রাজপথে থাকা তরুণীর বিরুদ্ধে হঠাৎ করে এমন অঙ্ক এটা কি সত্যিই বিচারিক অনুসন্ধানের ফল, নাকি ভয় দেখানোর রাজনৈতিক সংখ্যা?’

পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন রেখে সেই ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, প্রশ্ন হলো ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ কোথায়? ব্যাংক ট্রান্সফার? মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল ট্রেইল? সাক্ষী? নাকি শুধু অভিযোগ আছে এই এক লাইনের ওপর ভর করেই জেল?
আম্মার আরও লিখেছেন, ‘আরও অদ্ভুত বিষয় হলো একদিকে বলা হচ্ছে চাঁদাবাজি, অন্যদিকে পত্রিকার ভাষ্য সেনাবাহিনী প্রধানকে নিয়ে অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ও রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য। তাহলে আসল অভিযোগ কোনটা? চাঁদাবাজি না মতপ্রকাশ? যদি চাঁদাবাজি হয়, তাহলে রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য টেনে আনার দরকার কেন? আর যদি বক্তব্যই অপরাধ হয়, তাহলে চাঁদাবাজির মতো ভয়ংকর লেবেল লাগানোর মানে কী? এটা কি আইনি প্রক্রিয়া, নাকি ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন? সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটা এখানে আজ সে জেলে, কাল আপনি, পরশু আমি। আর তখন রাষ্ট্র বলবে চাঁদাবাজ ধরা পড়েছে। প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা আগেই চুপ থাকতে শিখে গেছি। এই দেশে এখন অভিযোগই সাজা, গ্রেপ্তারই প্রমাণ আর সংবাদ শিরোনামই রায়। প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়,নীরবতাই অপরাধ। আজ যদি আমরা না বলি প্রমাণ দেখাও, মামলার অবস্থা কী,চার্জশিটে কী লেখা আছে,বিচার কোথায়!! তাহলে কাল যখন কাউকে তুলে নেওয়া হবে লোকজন শুধু বলবে কিছু একটা করেছিল তাই তো ধরছে। এইটাই সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রবিরোধিতা’
জুলাই ঐক্যের অন্যতম সংগঠক ইসরাফিল ফরাজী গতকাল সোমবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘এই সেই দুর্জয়। তাহরিমাকে কক্সবাজারে যাওয়ার কু প্রস্তাব করে। রাজি না হওয়ায় প্রথমে তাহরিমার নামে ভুয়া সংবাদ প্রচার করে। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে লিয়াজু করে তাহরিমার নামে ৫০ কোটি টাকার মামলা করে। তাহরিমা এখন জেলে আর দুর্জয় এই ঘটনায় বসুন্ধরার মিডিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে চাকরি হারিয়ে সন্তোস শর্মার সেল্টারে কালবেলায় সাংবাদিকতা করে।’
দুর্জয়কে যখন কালবেলায় নিয়োগের কথা হয়, তখন কালবেলা থাকা সাংবাদিকরা সন্তোষ শর্মাকে বলেছিল তার কু কীর্তির কথা। তখন সন্তোষ শর্মা বলেছিল চাপ আছে এই ছেলে নিয়োগ দিতে। কালবেলার বর্তমান মালিকও বিএনপির বড় নেতা। এই চাপ কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, বিএনপি নেতার নাকি ভারতের?
উল্লেখ্য, সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় ঘটনার সময় বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালবেলায় কাজ করছেন।
পড়ুন: পরিবেশ ভালো আছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়া সম্ভব: সিইসি
আর/


