একসময় খুলনার রাজনীতিতে মুসলিম লীগ ছিল শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটি নাম। প্রায় চার দশক আগে এ অঞ্চলকে দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য তখন মুসলিম লীগ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দলের প্রধান খান এ সবুর দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার তিনটি আসনে জয়ী হয়ে দলের প্রভাবের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দাপট হারিয়ে আজ দলটি কার্যত অস্তিত্ব সংকটে।
বর্তমানে মুসলিম লীগের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে স্যার ইকবাল রোডের গোল্ডেন কিং ভবনের একটি সাইনবোর্ডে। দলীয় তৎপরতা বলতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অভ্যন্তরীণ বৈঠক ও দলীয় প্রধানের মৃত্যুবার্ষিকী পালন। নেই কোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা অবরোধ কর্মসূচি। রাজপথেও বহু বছর ধরে দলটির কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও খুলনার কোনো আসনে দলটি প্রার্থী দেয়নি।
পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলটি সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও শেষ পর্যন্ত খুলনায় বিজয়ী হন বিরোধী জোট কপের মনোনীত প্রার্থী মাদারে মিল্লাত ফাতেমা জিন্নাহ। ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও দলটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটিতে সম্পৃক্ততার কারণে ১৯৭১ সালের পর মুসলিম লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে দলটি আবার রাজনীতির সুযোগ পায়। সে সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দলের প্রধান খান এ সবুর খুলনা-৬, খুলনা-৮ ও খুলনা-১৪ আসনে নির্বাচিত হন। পরে তিনি খুলনা সদর আসন রেখে বাকি দুটি আসন ছেড়ে দেন।
১৯৮১ সালের ২৫ জানুয়ারি খান এ সবুরের মৃত্যুর পর থেকেই দলের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন ক্রমশ কমতে থাকে। দলের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে অন্য রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হয়। দলীয় সূত্র জানায়, কাঠামোগতভাবে সংগঠন থাকলেও ভিত্তি দুর্বল এবং জনসমর্থন কার্যত নেই। সামাজিক বা ইস্যুভিত্তিক কোনো কর্মসূচিতেও দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায় না।
বর্তমানে জেলা ও নগর কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ। খুলনা নগরীর আটটি থানা ও জেলার নয়টি উপজেলায় কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তবুও অধ্যাপক ফকির রেজা উদ্দিন, অ্যাডভোকেট আক্তার জামান রুকু, শেখ জাহিদুল ইসলাম, শেখ বাবর আলী ও অধ্যাপক জাকির হোসেনসহ কয়েকজন নেতা দলীয় কার্যক্রম সীমিত পরিসরে টিকিয়ে রেখেছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে খুলনা-২ আসনে অ্যাডভোকেট আক্তার জামান রুকু, খুলনা-৩ আসনে অধ্যাপক ফকির রেজা উদ্দিন এবং খুলনা-৪ আসনে শেখ বাবর আলী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
এ প্রসঙ্গে নগর শাখার সভাপতি শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। কেন্দ্রীয় সংগঠন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকায় খুলনায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পড়ুন- এই নির্বাচন আগামী ৫০ বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করবেঃ ফাওজুল কবির খান


