১৪/০১/২০২৬, ২২:২৩ অপরাহ্ণ
20 C
Dhaka
১৪/০১/২০২৬, ২২:২৩ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ মীমাংসার সুযোগ ছিল, কিন্তু দমননীতি নেন শেখ হাসিনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সহজেই আন্দোলনের অবসান ঘটাতে পারতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি অবজ্ঞা ও দমননীতির পথ বেছে নেন এবং তাদের ইতিহাসের নজিরবিহীন নৃশংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। 

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছর ১৭ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন। ৫৭ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে এই রায় প্রকাশ করা হয়। ৪৫৭ পৃষ্ঠার রায়ে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কীভাবে দমনপীড়ন ও হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হয়, তা ফুটে উঠেছে।  

রায়ে শেখ হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি দেশে থাকা তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল মামলার সাক্ষী থেকে রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে। 

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ‘সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সৌহার্দ্যপূর্ণ পন্থায় মীমাংসায় পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। যে কোটা পদ্ধতি তিনি আগেই একবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছিলেন। কিন্তু একই ইস্যু আবার কেন পুনরুজ্জীবিত হলো।’

এতে আরও বলা হয়, ‘আন্দোলনের সময় বৃদ্ধ, শিশু, নারীসহ আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতা, বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে প্রদর্শিত ভিডিওতে হতাহত আন্দোলনকারীদের আর্তনাদ এবং মাথার খুলি, চোখ, নাক, হাত-পা হারানো ভুক্তভোগী সাক্ষীদের দেখে কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন।’
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘এই ধরনের নৃশংসতা যে কোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা উচিত এবং এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে ব্যর্থ হতে দেওয়া উচিত নয়।’ 

এ ছাড়া রায়ে সুনির্দিষ্ট দুটি অপরাধের অধীনে মোট ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এক নম্বর অভিযোগে তিনটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে শেখ হাসিনার দেওয়া ‘সুপরিকল্পিত উস্কানিমূলক’ বক্তব্য। দ্বিতীয়ত, ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ সরাসরি উস্কানি ও নির্দেশ। রায়ে বলা হয়, অধস্তনদের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আসামিরা কোনো বাধা দেননি। তৃতীয়ত, এসব উস্কানি ও নির্দেশের ধারাবাহিকতায় রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দুই নম্বর অভিযোগেও তিনটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এখানে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপের তথ্য। 

রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব কথোপকথনে ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় এবং হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এরই জেরে ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এ ছাড়া একই দিন সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর পেট্রোল ঢেলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। এই অপরাধগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। 

রায়ে ট্রাইব্যুনাল একটি নজিরবিহীন নির্দেশনা দিয়েছেন। দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামে দেশে বিদ্যমান সব স্থাবর যেমন– জমি ও বাড়ি এবং অস্থাবর যেমন– ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ার সম্পত্তি রাষ্ট্রকে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই বাজেয়াপ্ত করা অর্থ ও সম্পদ যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে উপনীত হলো। ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায়টি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিরীহ জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধের বিচারিক দলিল হিসেবে এটি সংরক্ষিত থাকবে।

পড়ুন: নির্বাচন উপলক্ষে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানে নতুন নির্দেশনা

দেখুন: এবারের নির্বাচন ঋণখেলাপিদের সংসদের বাইরে পাঠানোর নির্বাচন: হাসনাত আবদুল্লাহ 

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন