বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগ যাঁদের হাত ধরে বর্ণিল হয়ে উঠেছিল, ইলিয়াস জাভেদ তাঁদের অন্যতম। জন্ম পাকিস্তানে হলেও তিনি নিজের জীবন, শিল্প আর ভালোবাসা উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশকে। শেষ পর্যন্ত এই দেশের মাটিতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল,যে দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন হৃদয়ের গভীর থেকে।
একসময় পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার এলাকায় বসবাস করতেন জাভেদ। এলাকাবাসীর ভালোবাসা ও সম্মানে সেই মহল্লাটিই পরিচিত হয়ে ওঠে তাঁর নামেই-‘জাভেদ মহল্লা’। জীবনের সুস্থ সময়গুলোতে সুযোগ পেলেই তিনি ফিরে যেতেন সেই এলাকায়, কাটাতেন প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময়। পরবর্তী সময়ে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে।
১৯৬৪ সালে উর্দু ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক। তবে ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘পায়েল’ ছবিটি তাঁকে এনে দেয় তুমুল জনপ্রিয়তা। নায়করাজ রাজ্জাক ও শাবানার সঙ্গে এই ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন জাভেদ। এরপর ‘নিশান’ সিনেমার মাধ্যমে নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা পৌঁছে যায় শীর্ষে। বাংলা সিনেমা ইন্ডাষ্ট্রিতে অপরিহার্য নায়ক হয়ে উঠেন তিনি।
‘মালকা বানু’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘চোরের রাজা’, ‘জালিম রাজকন্যা’—এমন অসংখ্য আলোচিত ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন ও সুচরিতার মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল দর্শকনন্দিত।
তবে জাভেদ নাক হওয়ার আগ তার প্রধান পরিচয় তিনি ছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্যপরিচালক। তাঁর প্রকৃত নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় মুম্বাইয়ে। কিংবদন্তি সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে তালিম নেন তিনি। বলিউডের প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার সরোজ খানের সঙ্গে একসঙ্গে নাচ শেখার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর।
দেশে ফিরে অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালনায় নতুন ধারা আনেন জাভেদ। লোকগান হোক বা শহুরে গান—নায়ক-নায়িকাদের নাচে তিনি যোগ করেন ছন্দ, শরীরী ভাষা ও নাটকীয়তা। তাঁর হাত ধরেই বলা চলে বাংলা সিনেমার নাচে আসে এক নতুন যুগ। কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, সুচরিতাসহ প্রায় সব শীর্ষ নায়িকা তাঁর কোরিওগ্রাফিতে পর্দা মাতিয়েছেন।
শুধু নায়িকারা নন, রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো নায়করা নাচ শিখেছেন তাঁর কাছ থেকে। নাচের গুরু হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র—‘ওস্তাদ’।
জাভেদের স্ত্রী ডলি জাভেদের ভাষায়, নায়ক বা কোরিওগ্রাফার—দুই পরিচয়েই তিনি ছিলেন সুপারস্টার। শেষ সময়ে হয়তো তাঁকে ঘিরে আলোচনার ঝলক কম, কিন্তু প্রকৃত শিল্পীরা কখনো ভুলেন না। তাকে সসময়ই তাঁকে স্মরণেও সম্মানে রেখেছেন।
জাভেদের সর্বশেষ অভিনীত চলচ্চিত্র ‘মা বাবা সন্তান’। এরপর আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো হয়নি তাঁর। বয়স ও অসুস্থতায় ধীরে ধীরে অন্তরালে চলে যান একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই নায়ক। সময়ের নিষ্ঠুরতায় রঙিন জীবনের অনেক রঙ ফিকে হয়ে গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া কাজ, নাচ, গান আর স্মৃতি রয়ে গেছে অমলিন।
পড়ুন: বাংলাদেশের সমর্থনে এবার আইসিসিকে চিঠি পাঠাল পিসিবি
দেখুন: পুলিশ-বিএনপি সং ঘর্ষে উত্তপ্ত রাজধানী
ইম/


