দীর্ঘ দেড় যুগের নির্বাসন শেষে দেশের মাটিতে পা রেখেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার আগামীর দর্শন, স্বপ্ন, ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বাংলাদেশের পরবর্তী অবস্থান। ‘Exclusive: Bangladesh’s Prodigal Son’— শীর্ষক প্রতিবেদনে তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে বড় পরিসরে।
প্রতিবেদনে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, গত ২৫ ডিসেম্বর যখন তারেক রহমান ঢাকায় পৌঁছান, তখন লাখ লাখ সমর্থক তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। এর মাত্র পাঁচ দিন পর তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাকে শোকাহত করলেও, তিনি একে দেশ ও জনগণের প্রতি বড় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার নিজ বাসভবনে অবস্থান করছেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে নিজেকে অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, মা তাকে শিখিয়েছেন দায়িত্ব পালনে কোনো আপস না করতে।
সাংবাদিক চার্লি ক্যাম্পবেলের নেয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানকে বেশ পরিমিত এবং অন্তর্মুখী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় লন্ডনের রিচমন্ড পার্কে ঘুরে বেড়ানো বা ইতিহাস বই পড়ে কাটানো এই নেতা এখন অনেক বেশি ‘পলিসি ওঙ্ক’ বা নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে সচেতন। তিনি আগের চেয়ে অনেক ধীরস্থিরভাবে কথা বলেন এবং অন্যের কথা শুনতে পছন্দ করেন।
মূলত, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমান এখন আলোচনার তুঙ্গে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি নিজেকে দেখছেন এক সেতুবন্ধন হিসেবে। যিনি একই সাথে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শের উত্তরাধিকারী এবং তরুণ প্রজন্মের বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট, মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি একগুচ্ছ বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তারেক রহমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দেশের সেচ ব্যবস্থা ও পানির স্তর রক্ষায় ১২ হাজার মাইল খাল খনন, প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ রোপণ এবং ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তনের কথা ভাবছেন তিনি। এছাড়াও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, ‘আমি যা পরিকল্পনা করেছি তার ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে দেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’
এতে বলা হয়, গত ১৫ বছরে বিগত সরকারের নির্দেশে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলা এবং অপপ্রচার চালানো হলেও জনমনে তার জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে। সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি’র প্রতি সমর্থন এখন প্রায় ৭০ শতাংশ। তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সকল দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কোনোটিরই প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা বিগত দিনের দুর্নীতি ও ‘খাম্বা তারেক’ উপাধির প্রসঙ্গও আনা হয়েছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, বিগত সরকার এসব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তাকে জেল ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জেলখানায় নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডের সমস্যা আজও তাকে কষ্ট দেয়, যা তিনি জনগণের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন।
দেশে জাতিগত ও ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়গুলোর পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বজার রাখার নেপথ্যেও নিজের ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন তারেক রহমান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সেই তালিকায় ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় একযোগে কাজ করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন। আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখবো। কিন্তু আমরা একে অপরকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত মি. ট্রাম্প খুবই যুক্তিসঙ্গত মানুষ।
অন্যদিকে, ভারতের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। শেখ হাসিনাকে ভারতের আতিথেয়তা এবং আওয়ামী লীগ-পন্থী প্রচারণার প্রসারেই তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লিকে প্রধান খলনায়ক করে তুলেছে বলেও মনে করেন তারেক। তবে বিগত সরকারের দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে তিনি একটি ‘নতুন বাংলাদেশের’ সূচনা হিসেবে দেখছেন।
আ.লীগের ১৫ বছরের জুলুম ও নিপীড়নে ৩৫০০-এর বেশি মানুষ গুম হয়েছে এবং অসংখ্য প্রাণ ঝরেছে। তবে তারেক রহমান ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বদলে আইনের শাসনে বিশ্বাসী।
তারেক রহমান বলেন, ‘যারা অপরাধ করেছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি পেতে হবে।’ খালেদা জিয়ার জানাজাতেও তিনি রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি জনপ্রিয় স্পাইডার-ম্যান সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বিরাট ক্ষমতার সাথে বিরাট দায়িত্বও আসে’। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এবং জুলাই বিপ্লবে শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করা তার প্রধান দায়িত্ব এখন।
পড়ুন : নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছে: তারেক রহমান


