28.5 C
Dhaka
০২/০৩/২০২৬, ১৯:২০ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

সেনাবাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান:আটকের ১৭ ঘন্টার পর ফোনে জানতে পায় মৃত্যুর খবর

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় বরিশাল জেলার মুলাদী সেনা ক্যাম্প থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে রাসেল কাজী (২৮) নামে এক যুবককে আটক করা হয়েছিল এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গতকাল শনিবার ভোরে ৬টার দিকে কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের উত্তর আন্ডারচর এলাকার রাসেলকে তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। আটকের ১৭ ঘন্টার পর। রাত ১১টার দিকে পরিবার থেকে সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা(সেনাবাহিনী) জানায় রাসেল কাজী মারা গেছেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর থেকে রাসেলকে বেদম মারধর করার কারনে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু বিচার ও তদন্তের দাবি করেছেন স্বজনরা।


এদিকে এ ঘটনায় রোববার(৮ ফেব্রুয়ারী দুপুর ৩টা থেকে বিকেলে ৪টা দিকে নিহতের বাড়ির সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী। এ সময় তাঁরা মুলাদী সেনা ক্যাম্পের সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের মাধ্যমে রাসেল কাজীকে হত্যার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।


নিহত রাসেল কাজী সাহেবরামপুর ইউনিয়নের উত্তর আন্ডারচর এলাকায় আলম কাজীর সেজ ছেলে। রাসেল ঢাকার একটি বিরিয়ানির দোকানে চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী ও এক মেয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন।


পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজনের সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের মুলাদী উপজেলার উত্তর আন্ডারচর গ্রাম। এই গ্রামে আধিপত্য নিয়ে প্রায়ই বোমা বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই এলাকায় হাতবোমা ও মাদক উদ্ধারে অভিযানে আসেন মুলাদী সেনা ক্যাম্পের এক দল সেনা সদস্য। এ সময় তাদের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিও ছিলেন। স্থানীয় ওই ব্যক্তিদের তথ্য মতে, রাসেল কাজীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রাসেলকে আটক করে সেনা সদস্যরা। এ সময় তাকে ঘর থেকে বাহিরে বের করে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে তল্লাসি চালানো হয়। পরে রাসেলের কাছে মাদক ও বোমার সন্ধান চেয়ে বেদম মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। একপর্যায় আহত অবস্থায় রাসেলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে ওই এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে যান সেনা সদস্যরা। পরে রাসেলকে নিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদে থাকা একটি ট্রলার যোগে মুলাদী ক্যাম্পে চলে তাঁরা।


নিহতের পরিবার জানায়, ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে রাসেলের পরিবার তার সন্ধান চেয়ে কালকিনি ও মুলাদী থানা ও সেনা ক্যাম্পে যোগাযোগ করেন। একপর্যায় রাত ১১টার দিকে রাসেলের পরিবার ফের জানতে চাইলে কালকিনি ও মুলাদি সেনা ক্যাম্পের থেকে মুঠোফোনে রাসেলের মৃত্যু খবর দেওয়া হয়। পরে রাত ১টার দিকে কালকিনি থানা থেকে রাসেলের পরিবারকে লাশটি বুঝিয়ে নিতে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে রাসেলের দাফন কাফনের জন্য নগদ এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে রাসেলের পরিবার লাশটি গ্রহণ না করায় ওই লাশটি মুলাদী থানায় ফের পাঠানো হয়। একপর্যায় লাশটির ময়না তদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।


কালকিনি উপজেলা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর আন্ডারচর এলাকা। রোববার বেলা ১২টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাটি থমথমে। পুরুষ মানুষের চলাচল একদমি কম। খালের একপাশ মাদারীপুরের কালকিনির অংশ অন্যপাশ বরিশালের মুলাদির মধ্যে পড়েছে। রাসেলের বাড়িতে ঢুকতেই কান্না আর আহাজারির আওয়াজ। তার স্ত্রী, ৮ বছরের মেয়ে, মা, বাবা, ভাই ও আত্মীয় স্বজন সবাই কান্নাকাটি করছেন। আশেপাশের বাড়ির লোকজন এসে ভিড় করেছেন। সবাই শনিবারের ঘটে যাওয়ার নির্মম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আহাজারি করছেন।


নিহতের স্ত্রী জুলিয়া বেগম বলেন, ‘আমাগো চোখের সামনে তারা পিডাইছে, লাঠি দিয়া পিঠায় আর কয়, নাটক করস? আমার স্বামীরে কিহের লিগা আইনের মানুষ হইয়া এভাবে মারবো? আমার স্বামীর সঙ্গে পাবলিকও আইছে, তারাও মারছে। ও আল্লাহ গো, আমার স্বামী পানি খাইতে চাইছিল, হেইয়াও দেয় নাই। আমার মাইয়াডা কত কইরা কইছে, আমার বাপরে ছাইরা দেন, ওরেও থাপ্পর দিছে। কেউ শোনে নাই। আমার মাইডা এহন কারে বাপ কইয়া ডাকবে?’


জুলিয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দুদিনের ছুটি নিয়ে আসছিল। শনিবারই ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা। এ সময়ই সব শ্যাষ হইয়া গেল।’
নিহত রাসেলের বড় ভাই হাশেম কাজী বলেন, ‘আমার বাড়িতে সেনাবাহিনী আসার কোন প্রশ্নই আসে না। তবুও আসছে, কিন্তু সেনাবাহিনী অভিযানে এসে আমার ভাইকে গাছে বেধে পিটাইছে। বাড়ি থেকে বের করে মাঠে নিয়াও মারছে। আমার ভাইরে পানিডা পর্যন্ত খাইতে দেয় নাই। ভাইর এমন খবর পেয়ে ঢাকা থেকে সরাসরি বরিশাল গেছি। পরে মুলাদি সেনা ক্যাম্পে গেলে তারা ঘটনা অস্বীকার করেন। পরে রাতে কালকিনি সেনা ক্যাম্প আমাকে ফোন করে ক্যাম্পে দেখা করতে বলে। আর জানায়, আমার ভাইর লাশ নাকি ক্যাম্পে আসছে। পরে আমি লাশ নিতে রাজি না হলে কালকিনি থানার ওসিকে দিয়ে ১ লাখ টাকা অফার করে। কিন্তু লাশ ময়না তদন্ত ছাড়া আমি নিতে অস্বীকৃতি জানালে ওসি মুলাদী থানায় লাশটি পাঠিয়ে দেয়।’


আন্ডারচর এলাকার অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর আন্ডারচর এলাকায় মাদক ও বিস্ফোরক ক্রয় বিক্রয় করতেন আব্বাস শিকদার ও সেকেন ঢালী নামে দুজন ব্যক্তি। তাদের এ কাজে সহযোগিতায় ছিলেন বিপ্লব সরদার, আব্দুল হক সরদারসহ ওই এলাকার অন্তত ২০ জন ব্যক্তি। তাদের সবার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতিসহ একাধিক মামলাও রয়েছে। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন রাসেল কাজী ও তার বড় ভাই হাশেম কাজী। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায় রাসেলের বাড়িতে মাদক রয়েছে বলে সেনাবাহিনীর কাছে অভিযোগ জানায় আব্বাস শিকদার ও সেকেন ঢালীর লোকজন।

জানতে চাইলে মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরাফাত জাহান চৌধুরী বলেন, ‘লাশটির সুরতহাল করে বরিশাল মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে কী জানা গেল এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি আরও বলেন, এটা কী আমরা বলতে পারি, এটা বলবে ডক্টর। লাশটি কোথায় পেলেন জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘লাশটি হাসপাতালের মর্গে পাইছি। মর্গে কিভাবে গেল তার কারণ জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল ধরেননি।’


রাসের মৃত্যুর কারণ জানতে মুলাদী সেনা ক্যাম্পের দায়িত্বরত অধিনায়ক মেজর তৌফিকুর রহমানের কাছে মুঠোফোনে পরিচয় দিয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার একটা ফোন আসছে। আমি আপনাকে একটু পরে ব্যাগ করছি।’ এরপর ৩০ মিনিট বাদে তাকে একাধিক বার কল দেওয়া হলেও তিনি আর কল ধরেননি।’


তবে সেনাবাহিনীর হেফাজতে রাসেলের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনি সেনা ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর মো. আশফানুল হক মুঠোফোনে বলেন, ‘উত্তর আন্ডারচরের ঘটনা মুলাদী ক্যাম্প অপারেশন করেছে। আমাদের ক্যাম্পে একজনের লাশ আনা হয়েছিল, কারণ তারা (মুলাদী ক্যাম্প) আমাদের পাশ্ববর্তী ছিল। তা ছাড়া লাশের ঠিকানা কালকিনির মধ্যে। আমরা চেয়েছিল লাশটি পরিবারের কাছে দিতে, এ নিয়ে যেন আর কোন ঝামেলা তৈরি না হয়। পরিবর্তিতে নিহতের পরিবার সিদ্ধান্ত নিলেন লাশটির ময়না তদন্ত করবে, তাই লাশটি যেখান থেকে আসছে মুলাদী ক্যাম্প ও পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এটার কোন সম্পৃক্ততা আমাদের নাই। বিস্তারিত জানতে চাইলে মুলাদী ক্যাম্পে বা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

পড়ুন- ইতিহাসের সেরা ফলের পথে জামায়াত, জয়ের আশা বিএনপির: রয়টার্স

দেখুন- নির্বাচনী হালচাল: ব্রাহ্মণবাড়িয়া- ৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী শ্যামলের সাথে একদিন

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন