একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে প্রক্রিয়াটি জটিল এবং হিসাবনিকাশ করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে সময় দরকার। গতকাল সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সব শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের শেয়ারের নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক থাকায় এ নির্দেশ দেওয়া হয়। শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে আসছে, এসব ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এ নিয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বিভিন্ন সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও অর্থ উপদেষ্টা বেশ আগে বলেছিলেন, শেয়ারহোল্ডারদের কিছু দেওয়া যায় কিনা দেখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে গভর্নর জানান, সরকার চাইলে শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। তবে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ নেই।
ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারের কারণে আমানতকারীদের পাওনা ফেরত দিতে পারছিল না অনেক ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। একীভূতকরণের পর প্রথমে গত বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে এসব ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন স্থগিত করা হয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যেখানে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে।
পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সময় সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণ পাবেন বলে অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বলেছিলাম। এখন আমরা এটা বিবেচনা করব। গভর্নর সাহেব তাঁর মতো করে বলেছেন। তবে আমরা বলেছি, অবশ্যই যারা আমানতকারী, যাদের টাকা আছে সবাই পাবেন। ৪২ হাজার কোটি টাকা কেন দেওয়া হলো? দ্বিতীয় বিষয়টি হলো– শেয়ারহোল্ডার।’
তিনি বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের বিষয় হলো টেকনিক্যাল। ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেগেটিভ হয়ে যাওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া একটি কারিগরি ও জটিল বিষয়। টেকনিক্যালরা বলে ওরা শেয়ার কিনেছে, ওরা তো ওনার, আপনি দেবেন কেন? তবু আমি বলেছি, না, ওরা (শেয়ারহোল্ডাররা) হয়তো বাজারের সিগন্যাল দেখে শেয়ার কিনেছেন। দেখা যাক কতটুকু কী করা যায়।’
শেয়ার লেনদেন বন্ধের আগে স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে এই পাঁচ ব্যাংকে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মোট শেয়ার ছিল ২২০ কোটি ৭৫ লাখ। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার বিবেচনায় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মোট মূলধন দুই হাজার ২০৭ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর সর্বশেষ পরিশোধিত মূলধন ছিল পাঁচ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৩৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘কীভাবে (ক্ষতিপূরণ) দেব, সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। অবশ্যই পরবর্তী অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যখন নেতিবাচক হয়ে যায়, তখন পুরো দায় একতরফাভাবে শেয়ারহোল্ডারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যৌক্তিক নয়।’
সে ক্ষেত্রে কি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন– এমন প্রশ্ন করলে সালেহউদ্দিন বলেন, ‘কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে তার মডেল তৈরি করতে একটু সময় লাগবে। ধরেন কেউ বহু টাকার শেয়ার কিনেছেন, তাঁকে আংশিকভাবে শেয়ার দেওয়া হতে পারে বা বাকিটুকু হয় তো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতে পারে। ওটা একটু হিসাব করতে হবে। কারণ বার্ডেনটা (বোঝা) তো পুরোটা শেয়ারহোল্ডাররা নিতে পারেন না।’
ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু এককালীন সিদ্ধান্তে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।’ অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী না করলে ব্যবসা-বাণিজ্য দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকনির্ভরই থেকে যাবে। ইকুইটি পার্টিসিপেশন ও বন্ড মার্কেট ছাড়া টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চলমান উদ্যোগগুলো পরবর্তী সরকার ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিলে ব্যাংক খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গড়ে ৭৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি। আমানত বীমা তহবিলের আওতায় প্রত্যেক আমানতকারীকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার পাশাপাশি একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে দুই বছরের জন্য ব্যাংক রেট তথা ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবশ্য চলতি বছর থেকে বাজারভিত্তিক এবং ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত ঘোষিত মুনাফা পাবেন আমানতকারীরা।
পড়ুন:দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় পরিবর্তন, এগিয়ে কোন দেশ
দেখুন:মুখ ফিরিয়েছে বাংলাদেশ, অথৈ সাগরে ভারতের পেঁয়াজ ব্যবসা |
ইম/


