১২/০২/২০২৬, ১৬:৫৯ অপরাহ্ণ
28 C
Dhaka
১২/০২/২০২৬, ১৬:৫৯ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ইন্ডিয়া টুডের নিবন্ধ: জামায়াতের বিস্ময়কর উত্থান

বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রথম এই জাতীয় নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বিভিন্ন জরিপ ও পর্যবেক্ষণ। এক সময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এখন শুধু আলোচনায় নয়, সম্ভাব্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও উঠে এসেছে। তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ, ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘু ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন বার্তা— সব মিলিয়ে দলটির এই উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-তে এক নিবন্ধে যুধাজিৎ শঙ্কর দাস লিখেছেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমাকে বারবার বলেছেন, ‘ভারতে আপনারা জামায়াতকে বোঝেননি’। স্বীকার করছি, শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে যে রকম উত্থান আমরা এখন দেখছি, তা আমি কল্পনাও করিনি।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি জামায়াত, বিএনপি ও বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ— সব দলের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখেছি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারত যাওয়ার এক দিন আগে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন যে আসন্ন— এই খবর প্রথম জানায় ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে বৃহস্পতিবার।

নিষেধাজ্ঞা থেকে মূলধারায়

ক্যাডারভিত্তিক দল হিসেবে সংগঠনগত শক্তির দিক থেকে জামায়াতের অবস্থান আওয়ামী লীগের সমকক্ষ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগে-পরে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মী ও ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ অনেক নেতা কারাবন্দি ছিলেন। তবু মনে হচ্ছে, অতীতের ছায়া পেরিয়ে জামায়াত আবার সামনে এসেছে। জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটকে ভোটারদের একটি অংশ সুযোগ দিতে প্রস্তুত।

এই জোটে রয়েছে জুলাই আন্দোলনের নেতাদের গড়া এনসিপিও। তাদের প্রতিশ্রুতি—‘পরিবর্তন’। অন্যদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এগিয়ে থাকলেও দলের একটি অংশের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

ঢাকার রাজনৈতিক ভাষ্যকার ড্যানিয়েল রহমানের ভাষায়, ‘নতুন বন্দোবস্তের আকর্ষণ খুবই শক্তিশালী, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। কেউ কেউ এনসিপি-জামায়াত জোটকে পছন্দ না করলেও তারা নতুন ধরনের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করছে— এটা তাদের আকর্ষণ করছে’। তবে তিনি যোগ করেন, ‘বিএনপি তাদের পুরোনো ধাঁচের রাজনীতির মাধ্যমে স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।’

প্রায় চার কোটি নতুন ভোটার, যারা মূলত হাসিনার শাসনকাল দেখেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে আগের প্রজন্মের মতো আবেগগতভাবে যুক্ত নয়— তাদের ভূমিকাই হতে পারে নির্ণায়ক। নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও জামায়াত নেতা মুহাম্মদ নকীবুর রহমান বলেন, ‘পুরোনো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিনির্ভর রাজনীতিতে নতুন ভোটাররা আস্থা পাচ্ছেন না। তারা পরিবর্তন চান।’

ড্যানিয়েলের মতে, ফল একপেশে হতে পারে, তবে লড়াই একতরফা হবে না। আগে আলোচনা ছিল বিএনপি ২৫০ না ২৮০ আসন পাবে। এখন জরিপে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস আসায় উত্তেজনা বেড়েছে।

জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নকীবুর রহমান বলেন, গত দেড় বছরে দলটি সরাসরি মানুষের কাছে গেছে, তরুণদের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়েছে। তার দাবি, ‘জামায়াতকে অমানবিকভাবে তুলে ধরার দীর্ঘদিনের প্রচার অনেকেই অতিরঞ্জিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বুঝতে পেরেছেন।’

সংখ্যালঘুদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা?

হাসিনার পতনের পর অস্থির সময়ে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ-প্রশংসা— দুই-ই শোনা গেছে জামায়াতকে ঘিরে। অনেক এলাকায় মন্দির ও হিন্দুদের বাড়ি পাহারা দেয়ার কথাও স্থানীয়রা বলেছেন। ড্যানিয়েল রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের পরিবারগুলো যখন বিপাকে পড়েছিল, তখন বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত নেতাকর্মীরাই আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছেন।

নকীবুর রহমান দাবি করেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, তারা জামায়াতের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি’। খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দী নামে এক হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

কৃষ্ণ নন্দী এক বিদেশি সংবাদমাধ্যমে লিখেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কোনও হিন্দুকে বাংলাদেশ ছাড়তে হবে না, কাউকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। তারা মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে এই দেশেই বাস করবেন।’

ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ধর্ম যাই হোক, সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে কিছু নেই।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক

বিএনপির মতো জামায়াতের বিরুদ্ধেও পাকিস্তানপন্থি ঝোঁকের অভিযোগ আছে। তবে নকীবুর রহমান তা নাকচ করে বলেন, ‘জামায়াত বাংলাদেশপন্থি দল। গত ৫৫ বছরে পাকিস্তানপন্থি কোনও এজেন্ডা দলটির নেতৃত্বের বক্তব্যে পাবেন না।’

শফিকুর রহমানও বলেছেন, ‘ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, অগ্রাধিকারেই থাকবে।’

আওয়ামী লীগকে ঐতিহ্যগতভাবে সমর্থনকারী হিসেবে দেখা হলেও, ঢাকা নিয়ে ভারত নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছে বলে খবর সামনে আসছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ডিসেম্বরে ঢাকায় গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গেও চার দফা বৈঠক হয়েছে।

নকীবুর রহমানের ভাষ্য, ‘ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় জামায়াত উন্মুক্ত। তবে সেই উন্মুক্ততার সমান প্রতিদান সবসময় পাওয়া যায়নি।’

তিনি জানান, হৃদরোগে অস্ত্রোপচারের পর গত বছরের আগস্টে এক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিক শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেন। জামায়াত সেটিকে উপযুক্ত মনে করেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং নির্বাচনের আগে যে ইতিবাচক হাওয়া তৈরি হয়েছে— তা দলটির পক্ষে কাজ করতে পারে।

এক সময়ের ছায়াচ্ছন্ন অবস্থান পেরিয়ে জামায়াতে ইসলামী এখন বাংলাদেশের রাজনীতির বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত। এবারের নির্বাচনে তাদের সাফল্য কতটা হবে, তা জানা যাবে ১৩ ফেব্রুয়ারি। তবে এটা স্পষ্ট— বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে এখন গুরুত্ব দিয়ে হিসাবের মধ্যে ধরতেই হবে।

পড়ুন: ‘ভরাডুবির হতাশায় একটি দলের কর্মীরা ভোটার-এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন